খেলাধুলাপ্রধান নিউজ

‘হাজারেরও বেশি বর্ণবাদের শিকার হয়েছি’, সরব লামিনে ইয়ামাল

নিউজ দর্পণ, স্পোর্টস ডেস্ক: ফুটবল মাঠে বয়সের তুলনায় অসাধারণ পরিণত লামিনে ইয়ামাল। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বার্সেলোনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন তিনি। স্পেনের হয়ে জিতেছেন ইউরো ও বিশ্বকাপ ট্রফি। চলতি মৌসুমেও দুর্দান্ত ফর্মে আছেন এই তরুণ ফরোয়ার্ড। তবে মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনে তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে বর্ণবাদের মতো তিক্ত অভিজ্ঞতাও। ইয়ামালের দাবি, ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত প্রায় ‘হাজারবার’ বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন তিনি।

স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মুভিস্টারের একটি সাক্ষাৎকারে বর্ণবাদ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন ইয়ামাল। সাক্ষাৎকারটি স্পেনে ১৮ সেপ্টেম্বর সম্প্রচার হওয়ার কথা। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের কিছু অংশে বর্ণবাদ নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে দেখা গেছে বার্সেলোনা তারকাকে। ইয়ামাল বলেন, ‘হাজারবার (বর্ণবাদের শিকার হয়েছি)।’

তরুণ এই ফুটবলারের মতে, সব সময় সরাসরি বা ইচ্ছাকৃতভাবে বর্ণবাদ প্রকাশ পায় না। অনেক সময় মানুষ এমন কিছু মন্তব্য বা আচরণ করে, যেগুলো নিজেরাও বর্ণবাদী বলে মনে করে না। কিন্তু সেই মন্তব্য কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেও বর্ণবাদের প্রকাশ থাকতে পারে। ইয়ামাল বলেন, ‘মানুষ কখনো কখনো আপনার প্রতি পরোক্ষভাবে বর্ণবাদী আচরণ করে, যদিও তারা নিজেরাই সেটা বুঝতে পারে না। অনেক মন্তব্য বা দৃষ্টি আছে, যেগুলো বর্ণবাদী, কিন্তু যারা এগুলো করে তারা তা উপলব্ধি করে না।’

তবে এমন অভিজ্ঞতা তাকে বর্ণবাদ মেনে নিতে শেখায়নি- এ বিষয়টিও স্পষ্ট করেছেন ইয়ামাল। বরং তিনি মনে করেন, কোনো ভুল বা অন্যায়কে কখনোই স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। তবে ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে এখন তিনি সেগুলোকে নিজের খেলায় প্রভাব ফেলতে দেন না।

ইয়ামালের ভাষায়, ‘আমি এখন এমন একটা জায়গায় আছি, যেখানে বিষয়টি মেনে নেওয়া হয়েছে- এমন নয়। কারণ কোনো ভুল বিষয়কে কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। তবে যখন এমন কিছু ঘটে, তখন সেটা আমাকে আর বিরক্ত করে না। বর্ণবাদের শিকার হওয়ার একটি নির্দিষ্ট ঘটনার কথাও সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন ইয়ামাল। প্রতিপক্ষ সমর্থকের কাছ থেকে বর্ণবাদী মন্তব্য শোনার পরও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। তার সেই আচরণ তখন অনেকের নজর কেড়েছিল।

ইয়ামাল বিশেষ করে সান্তিয়াগো বার্নাবেউয়ের একটি ঘটনার কথা বলেছেন। সেখানে তাকে ও বার্সেলোনার সতীর্থ রাফিনিয়াকে উদ্দেশ করে গ্যালারি থেকে বিভিন্ন মন্তব্য করা হয়েছিল। সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং ইয়ামালের শান্ত থাকার বিষয়টি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

সেই ঘটনার প্রসঙ্গে ইয়ামাল বলেন, ‘বার্নাব্যুয়ের সেই পরিচিত ভিডিওটির কথা সবাই জানে। সেখানে রাফিনহা ও আমাকে উদ্দেশ করে বিভিন্ন ধরনের কথা বলা হচ্ছিল। আমার প্রতিক্রিয়া দেখে সবাই অবাক হয়েছিল।’

এরপর নিজের পরিচয়কে সামনে রেখে তিনি বলেন, ‘আমাকে কালো- বলা হলে তাতে আমার সামান্যও আপত্তি নেই, কারণ আমি কালোই। তবে ইয়ামাল স্পষ্ট করেছেন, একই শব্দ কাউকে অপমান করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। অর্থাৎ নিজের পরিচয়ের কোনো বিষয়কে তিনি অপমান হিসেবে দেখছেন না; আপত্তি হলো সেটিকে কাউকে হেয় বা আঘাত করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে।

তিনি বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় যে সে কথাটি আমাকে অপমান করার জন্য বলছে। কিন্তু আমি যদি একটি ম্যাচ খেলি এবং সে আমাকে দেখতে টিকিট কিনে মাঠে আসে, তাহলে শুধু আমাকে অসম্মান করা হয়েছে বলে আমি রেগে যাব না। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ইয়ামাল বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে স্পেনের হয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর তার পরিচিতি দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। স্পেন সেই আসরে চ্যাম্পিয়ন হয় এবং ইয়ামালও দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

এরপর থেকেই বার্সেলোনার হয়ে তার উত্থান আরও দ্রুত হয়েছে। ড্রিবলিং, গতি, সৃষ্টিশীলতা ও গোল করার ক্ষমতার কারণে ইতোমধ্যে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত তরুণ খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছেন তিনি। চলতি মৌসুমেও দুর্দান্ত ছন্দে আছেন ইয়ামাল। লা লিগায় ছয় ম্যাচে করেছেন সাত গোল। বার্সেলোনার আক্রমণভাগে তার ভূমিকা দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

কিন্তু মাঠের এই সাফল্যের আড়ালে বর্ণবাদের অভিজ্ঞতা যে তার ক্যারিয়ারের সঙ্গী হয়ে আছে, সাক্ষাৎকারে সেটিই তুলে ধরেছেন ইয়ামাল। একই সঙ্গে তার বক্তব্যে উঠে এসেছে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অবস্থানের একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি এটিকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য মনে করেন না, কিন্তু প্রতিটি মন্তব্যের সঙ্গে আবেগতাড়িত হয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানোরও প্রয়োজন মনে করেন না।

ইয়ামালের বক্তব্য আবারও ফুটবলে বর্ণবাদের পুরোনো সমস্যাটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। গ্যালারিতে সমর্থকদের আচরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্য কিংবা মাঠের বাইরে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ফুটবলারদের বর্ণবাদী আচরণের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। ইয়ামালের মতো বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরিচিত তরুণ তারকার এমন অভিজ্ঞতা বিষয়টির গুরুত্ব আরও সামনে এনেছে।

তবে ইয়ামালের কাছে নিজের পরিচয়ই তার শক্তি। তাই তাকে ‘কালো’ বলে ডাকা শব্দটি দিয়ে অপমান করার চেষ্টা হলেও তিনি সেটিকে নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবেই দেখেন। তার আপত্তি শব্দটিতে নয়, বরং কাউকে অপমান করার উদ্দেশ্যে সেটির ব্যবহারে। ১৯ বছর বয়সী এই তারকার বক্তব্যে তাই একই সঙ্গে রয়েছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার তিক্ততা এবং তা মোকাবিলার দৃঢ়তা। বর্ণবাদকে ভুল ও অগ্রহণযোগ্য উল্লেখ করেও তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, প্রতিপক্ষের কোনো মন্তব্য যেন তার ফুটবলকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে- সেটিই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *