মাঠ প্রশাসনকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করতে সংস্কার আনছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী
নিউজ দর্পণ, ঢাকা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘মাঠ প্রশাসনকে অধিকতর জনবান্ধব, স্বচ্ছ, দক্ষ, সেবামুখী ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে সরকার বিদ্যমান নীতি ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়নের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। আজ বুধবার বিকেলে সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। মো. নূরুল ইসলাম প্রশ্ন রাখেন, মাঠ প্রশাসনকে আরও বেশি জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে সরকারের বিদ্যমান নীতিমালার কোনো সংস্কার বা আধুনিকায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে কিনা? উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাঠ প্রশাসনকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে বর্তমানে সেবা সহজীকরণ, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, কর্মসম্পাদন পরিবীক্ষণ, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি, পরিদর্শন ও তদারকি, গণশুনানি কার্যক্রম, তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এরই অংশ হিসেবে ২০২৬ সালে সেবা সহজীকরণ নির্দেশিকা ২০২৬ এবং সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইট নির্দেশিকা, ২০২৬ এবং জেলা প্রশাসকদের কার্যক্রম মূল্যায়ন নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়াও, ডি-নথি, আইবাস, ই-নামজারি, ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা, ই-জিপি, অনলাইন জিডি, ই-রিটার্ন, ই-পর্চা, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় এবং হেল্পলাইন নাম্বার ৯৯৯, ৩৩৩-সহ নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এছাড়া সরকারি কর্মসম্পাদনের অধিকতর কার্যকর পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য গর্ভমেন্ট পারফরম্যান্স মনিটরিং সিস্টেম (জিপিএমএস) চালু করা হয়েছে এবং ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য সরকারি কর্মসম্পাদন পরিবীক্ষণ পদ্ধতি সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। মাঠ প্রশাসনের কার্যক্রমকে অধিকতর স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে প্রতিমাসে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বিভাগের সঙ্গে অনলাইনে সভা অনুষ্ঠিত হয় বলেও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, ভবিষ্যতে মাঠ প্রশাসনকে আরও জনবান্ধব ও নাগরিককেন্দ্রিক করার লক্ষ্যে সেবা প্রদানের প্রক্রিয়া আরও সহজীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভরতা বৃদ্ধি, কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও তথ্যপ্রকাশ, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং কর্মসম্পাদনের ফলাফলভিত্তিক পরিবীক্ষণ জোরদার করার মাধ্যমে বিদ্যমান নীতি ও ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়ন অব্যাহত থাকবে।’
চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হকের তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রামের সঙ্গে ঢাকার যাতায়াতে সময় ও দূরত্ব কমিয়ে আনার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম-ঢাকা করিডোরে ইলেকট্রিক ট্রেন পরিচালনায় ডিজাইন প্রণয়নের কাজ শেষ করেছে সরকার। মোহাম্মদ এনামুল হকের প্রশ্ন ছিলো, দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন চট্টগ্রামের সঙ্গে ঢাকার যাতায়াতে সময় ও দূরত্ব কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ইলেকট্রিক (বুলেট ট্রেন) ট্রেন চালু করার পরিকল্পনা সরকারের আছে কিনা; থাকলে কবে নাগাদ বাস্তবায়ন করা হবে? উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চট্টগ্রাম-ঢাকা করিডোরে ইলেকট্রিক ট্রেন পরিচালনার জন্য ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন স্থাপনের নিমিত্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং বিশদ ডিজাইন প্রণয়নের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর প্রকল্পের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ও সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, ‘অর্থায়ন প্রাপ্তি সাপেক্ষে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম-ঢাকা করিডোরে ইলেকট্রিক ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হবে। ফলে ট্রেনের গড় গতি বৃদ্ধি পাবে এবং যাতায়াতের সময় কমবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরের দূরত্ব হ্রাস করার লক্ষ্যে ঢাকা হতে কুমিল্লা পর্যন্ত কর্ডলাইন নির্মাণের উদ্দেশ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং বিশদ ডিজাইন প্রণয়নের কাজ চলমান আছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে দূরত্ব হ্রাস পাবে এবং গড় গতি বৃদ্ধি পাবে। তাই অল্প সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে যাতায়াত করা যাবে। সরকার ঢাকা হতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেলপথকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসব পদক্ষেপের আওতায় টঙ্গী- আখাউড়া এবং লাকসাম-চট্টগ্রাম পর্যন্ত ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং বিশদ ডিজাইন প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে। তন্মধ্যে, লাকসাম-চট্টগ্রাম ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া, টঙ্গী-আখাউড়া ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়ন শেষ পর্যায়ে। তারেক রহমান বলেন, ‘আশা করি এই প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম-ঢাকা করিডরে বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা এবং ট্রেনের গতি বৃদ্ধি পাবে।
প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদের এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সাময়িক সংকটকালীন সময়ে শিল্পখাত যাতে গ্যাস সংকটে না পড়ে, সেজন্য সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন, ২ডি ও ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনা এবং সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ ঙহংযড়ৎব গড়ফবষ চঝঈ ২০২৬ প্রণয়নের কার্যক্রম চলছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গড়ে দৈনিক ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। ভবিষ্যৎ গ্যাস সংকট মোকাবিলায় মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর টার্মিনাল থেকে ডিসেম্বর ২০৩০ নাগাদ গ্যাস সরবরাহের আশা করা হচ্ছে। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে এনে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্যাস প্রাপ্তি সাপেক্ষে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকেল সাড়ে তিনটায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের প্রথম ৩০ মিনিট ছিলো প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব।

