সাক্ষাৎকার

বাংলাদেশের সফল পররাষ্ট্রনীতির অনন্য দিকপাল শহীদ জিয়া

নিউজ দর্পণ, ঢাকা: শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে ভৌগোলিক দিক দিয়ে বিচার করতেন। উদাহরণ দিয়ে বলতেন মিশর, মরক্কো, স্পেনের ভৌগোলিক অবস্থানের একটা সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলাদেশ উপমহাদেশে সামরিক রাজনৈতিক কেন্দ্র বিন্দুতে অবস্থান করছে।

এর উত্তরে সুউচ্চ হিমালয় পর্বতশ্রেণী আর দক্ষিণে সুগভীর বঙ্গোপসাগর। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার যোগসূত্র স্থাপন করে রেখেছে বাংলাদেশকে তার আপন ভূখণ্ডের বৈচিত্র্য দিয়ে। তাই বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটিতে অতীতে অনেক উত্থান-পতন ঘটেছে। ইংরেজ জাতি বাংলাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল এই ভেবে এখান থেকে আন্তর্জাতিকভাবে চলাচলের সুবিধাজনক অবস্থান পূর্বে ও পশ্চিমের যাতায়াত।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় এর আগে ১৯৭২ সালে দৈনিক বাংলায় নিজের নামে লিখেছেন ‘একটি জাতির জন্ম’ সেখানে সংক্ষিপ্ত লেখার মধ্যে উপলব্ধি আছে এই ‘রাষ্ট্রের জন্মের প্রেক্ষাপট তার প্রয়োজনীয়তা ও রাষ্ট্রের জন্য করণীয়’। তিনি যখন যতটুকু সম্ভাবনা দেখেছেন তার সবটুকুই নাগরিকদের কল্যাণে দৃঢ় সংকল্পে করতে চেষ্টা করেছেন। দৃষ্টান্তও আছে নাগরিকরা তার সুফলও পেয়েছেন।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে যখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে গেলেন সেই সময়ে ভারত সরকার গঙ্গা নদীর পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নেয়। (গঙ্গা নদীটি আন্তর্জাতিক নদী যার অববাহিকা পদ্মা যমুনা নদীর সাথে যুক্ত হয়েছে।) বাংলাদেশ ভয়াবহ পানি সংকটে সম্মুখীন হয়।

দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চল পরিণত হয় মরুভূমিতে। ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা সম্ভব না হওয়ায় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে উত্থাপনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

বাংলাদেশ যেহেতু ভারতের ভাটি অঞ্চলে সেহেতু পানি ধরে রাখা ও পানি দ্রুত নদীর অববাহিকায় চলাচলের জন্য স্বেচ্ছা শ্রমে যুবকদেরকে নিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজে কোদাল হতে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেন।

তার সময়ে প্রায় ৪ হাজার খাল খনন করা হয়। এর ফলে কৃষি, মৎস্য, শুষ্ক-মৌসুমে পানি ধরে রাখা, নদী পথে যাতায়াতের সুবিধা হয়েছিল।

ফারাক্কা বাঁধের ভয়াবহতায় পানির সংকট নিয়ে প্রথমে ১৯৭৬ সালে মে মাসে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ৪২ জাতি ইসলামী শীর্ষ পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সম্মেলনে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একই বছরে আগস্টে কলম্বোতে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে উত্থাপন করে ন্যাম সদস্যদের সহানুভূতি পান। ৩১ তম জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদেও উত্থাপন করেন।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী চেতনা, দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি অবিচল আস্থার প্রতীক ছিলেন বিধায় জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব উত্থাপনের ফলে ভারত সরকার দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় আগ্রহ প্রকাশ করে। গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন প্রশ্নে ভারত সরকার ১৯৭৭ সালে নিরাপত্তা বিধান রক্ষা করে পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি করতে সম্মতি হয়।

শহীদ জিয়ার শাসন আমলে ইসলামী সলিডারিটি ফান্ডের স্থায়ী কাউন্সিলের সদস্য পদ লাভ করে। জেরুজালেম ও প্যালেস্টাইনের সমস্যা সমাধানে গঠিত আল-কদুস কমিটিতে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত ইরাক ইরান যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী কমিটির সদস্য করা হয়। ১৯৭৮-৮০ সালে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, ও শ্রীলঙ্কা সফর করেন। সফরে ইতিবাচক সাড়া পেয়ে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ছয়টি রাষ্ট্রের সরকার প্রধানের কাছে ১৯৮০ সালে ২৪ এপ্রিল প্রথম চিঠি পাঠান বিশেষ দূতের মাধ্যমে, তারা সবাই মন্ত্রী পরিষদের সদস্য ছিলেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর কাছে উপ-প্রধানমন্ত্রী জালালউদ্দিন আহমেদ, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের কাছে কৃষি মন্ত্রী মেজর জেনারেল (অবঃ) নুরুল ইসলাম শিশুকে, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মামুন আব্দুল গাইউমের কাছে মন্ত্রী কে এম ওবায়দুল রহমানসহ ছয়জন প্রতিনিধি।

জিয়াউর রহমান তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেন, আজকের সমসাময়িক বিশ্বে অর্থনৈতিক ও সামাজিক, সাংস্কৃতিক উন্নয়নের লক্ষ্য আঞ্চলিক সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, বাঁধা হচ্ছে ‘মানসিকতা’।

সম্পদে সমৃদ্ধি যতই হোক না কেন একাকী চেষ্টা করে এককভাবে কোনো দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পুরো সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হতে পারে না। আরো একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন সরকার প্রধানদের কাছে ১৯৮০ সালে ২ মে তারিখে।

১৯৮০ সালে ২৫ নভেম্বর দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ছয়টি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের কাছে আঞ্চলিক সহযোগিতা সম্পর্কিত একটি ওয়ার্কিং পেপার প্রেরণ করেন, তার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের শীর্ষ সংগঠন ‘সার্ক’ গঠিত হয়। ধারাবাহিক সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের মধ্যে দিয়ে, ২০০৫ সালে ত্রয়োদশ সম্মেলনে চেয়ারপার্সন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিকাল ৫ টা ১৫ মিনিটে অনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

ঐ সম্মেলনে সার্কের ‘প্রথম এওয়ার্ড’ দেয়া হয় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে যে এওয়ার্ডটি গ্রহণ করেছিলেন তার সুযোগ্য উত্তরসূরি জোষ্ট্যপুত্র বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান (তখনকার সময়ে সিনিয়র যুগ্ম মহা-সচিব।) প্রথম সার্ক এওয়ার্ড ঘোষণায় ভুটানের প্রধানমন্ত্রী নিয়নপো স্যানগে নিধুপ বলেন সার্কের ২০ বছর পূর্তিতে আমরা আপনার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার (স্বামী মরহুম জিয়াউর রহমান)-এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। তার দূরদৃষ্টিতে এবং উদ্যোগের ফলে আমাদের এই এসোসিয়েশন গঠিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে সার্কের ‘প্রথম এওয়ার্ড’ ঘোষণা করে আমরা দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সংহতি, অগ্রযাত্রা ও উন্নয়নের কথা পূর্ণব্যক্ত করালাম বলে বক্তব্য শেষ করেন।

শহীদ জিয়ার সময়ে বাংলাদেশ ২০টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য হিসেবে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সমক্ষ হয়েছিল।

তিনবিঘা করিডর চুক্তির রূপরেখা প্রণয়ন করেন। তালপট্টি মালিকানা দাবি প্রতিষ্ঠাও করেন। বাংলাদেশ শক্তিশালী জাপানকে ভোটে হারিয়ে জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদে সদস্য পদ লাভ করে।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে ভূ-রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বহির্বিশ্বের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের স্বতন্ত্র ও স্বকীয়তা বজায় রেখে পররাষ্ট্র নীতি পরিচালিত করেছেন।

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিকদের চাহিদা পূরণকে সামনে রেখে জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক প্লাটফর্ম তৈরী করেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি।

বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরি দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে, জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শন ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’কে ধারণ করে, গণতন্ত্রের মাতা বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ধারাবাহিক সংগ্রামের শক্তি ও সরকার পরিচালনার সাফল্যের মধ্যে দিয়ে আগামীর সুজলা-সুফলার বাংলাদেশের গড়ে উঠবে।
লেখক
শায়রুল কবির খান
সদস্য
বিএনপি মিডিয়া সেল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *