ব্যাংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার মামলায় ৪ দিনমজুর কারাগারে: পরিবারে চলছে কান্না আর আহাজারি

নিউজ দর্পণ, কুড়িগ্রাম: করোনা মহামারিতে সরকারি প্রণোদনার লোভ দেখিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে কুড়িগ্রামের ৫ দিনমজুরের ব্যাংক হিসাবে আড়াই কোটি পাঠিয়ে হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল একটি প্রতারক চক্র। প্রতারকরা টাকা তুলতে না পারলেও ফেঁসে গেছেন ওইসব দিনমজুররা। তাদের মধ্যে ৪ জন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অন্যজন।

ওই ৫ দিনমজুরের বাড়ি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের নওদাবশ গ্রামে। সোনালী ব্যাংক থেকে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯ হাজার ৯৬০ টাকা জালিয়াতির অভিযোগে তারাসহ ৯ জনের নামে মামলা হয়েছে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানায়।

গ্রেফতারকৃত ৪ জন হলেন- বিধবা ফুলমনি রানী, কমল চন্দ্র রায়, প্রভাস চন্দ্র রায় ও রনজিত কুমার রায়। তারা এখন রয়েছেন গাজীপুর জেলা কারাগারে। বাড়ি ছাড়া হয়েছেন সুবল চন্দ্র মোহন্ত নামের একজন। এসব খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্যে এমন বিপদ নেমে এসেছে সরকারি টাকা আত্মসাৎকারী একটি প্রতারক চক্রের প্রতারণার কারণে। তাদের পরিবারে চলছে কান্না আর আহাজারি।

জানা গেছে, ২ জুলাই সকালে ফুলবাড়ী থানা পুলিশের সহযোগিতায় ৪ দিনমজুরকে তাদের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে গাজীপুরের শ্রীপুর থানা পুলিশের একটি টিম। এর আগে ১ জুলাই শ্রীপুর থানায় মামলা করেন শ্রীপুর সোনালী ব্যাংকের হেডকোয়ার্টার শাখার ব্যবস্থাপক রেজাউল হক। মামলায় ৫ দিনমজুরসহ আসামি করা হয় প্রতারক চক্রের সদস্য শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বজলুর রশিদ, হিসাবরক্ষণ অফিসের অডিটর আরিফুর রহমান, মাস্টাররোল কর্মচারী তানভীর ইসলাম স্বপন ও ঢাকার উত্তরখান জামতলা এলাকার শাহেনা আক্তার।

শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের মাস্টারোল কর্মচারী কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার বাসিন্দা তানভীর ইসলাম স্বপন (৩২) করোনায় সরকারি প্রণোদনা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখান এসব দিনমজুরদের। ১৬ জুন ৫ জনকে নিয়ে যান সোনালী ব্যাংকের নাগেশ্বরী শাখায়। সেখানে তাদের নামে ব্যাংক হিসাব চালু করেন। তাদের শ্রীপুরে নিয়ে গিয়ে ব্যাংকের চেক বই ও বিভিন্ন কাগজপত্রে সই ও টিপসই নেন। তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেন ব্যাংকের সব কাগজপত্র ও চেক বই। ব্যাংক একাউন্টে প্রণোদনার টাকা পাঠানো হবে, এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। বাড়িতে এসে তারা ছিলেন প্রণোদনার টাকা পাওয়ার আশায়। কিন্তু টাকা নয়, পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছে।

মামলার পলাতক আসামি দিনমজুর সুবল চন্দ্র মোহন্তের সঙ্গে মোবাইলে কথা হলে তিনি জানান, তারা গাজীপুর ও শ্রীপুর কোনোদিন যাননি। তানভীর ইসলাম স্বপনই তাদের নিয়ে গেছেন। তাদের প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে প্রণোদনা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি।

সোনালী ব্যাংক নাগেশ্বরী শাখার ব্যবস্থাপক শরিফুল আজম জানান, ব্যাংক হিসাব চালুর কিছুদিন পর এসব ৫ দিনমজুরের হিসাব নম্বরে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯ হাজার ৯৬০ টাকা চলে আসে। এসব টাকা আসে সোনালী ব্যাংক হেড কোয়ার্টার শাখা থেকে। এরমধ্যে রণজিতের সঞ্চয়ী হিসাবে ৪৮ লাখ ৪৫ হাজার ৭২০ টাকা, প্রভাসের হিসাব নম্বরে ৬৫ লাখ ৭২ হাজার ১২০ টাকা, সুবলের হিসাব নম্বরে ৪০ লাখ ৭১ হাজার ৭২০ টাকা, কমলের হিসাব নম্বরে ৪২ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮০ টাকা এবং ফুলমণি রানীর হিসাব নম্বরে ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৫২০ টাকা।

কয়েকদিন পর অপরিচিত ৩/৪ জন লোক হিসাব নম্বর থেকে টাকা তুলতে আসলে তার সন্দেহ হয় এবং শ্রীপুর হেডকোয়ার্টার শাখায় যোগাযোগ করে টাকা উত্তোলন বন্ধ করা হয়। কিন্তু অপরিচিত লোকগুলোকে আটক করার আগেই তারা ব্যাংক থেকে সটকে পড়েন।

প্রভাস ও কমলের মা মালতি বেওয়া দিনরাত কাঁদছেন। ছেলেদের জন্য তিনি কেঁদে কেঁদে পাগল প্রায়। প্রভাসের স্ত্রী অঞ্জলী রানী বলেন, একদিন কাজ না করলে খাবার মেলে না। স্বামী জেলে যাওয়ার পর আমরা না অনাহারে অর্ধাহারে থাকছি।

রনজিতের স্ত্রী ভারতী রানী বলেন, আমার স্বামীসহ ৫ জনই নির্দোষ। শুধু অভাবের কারণে প্রণোদনার লোভে ব্যাংক হিসাব নম্বর চালু করেন। তারা এসবের কিছুই জানতেন না।

বিধবা ফুলমনী রানীর ছেলে সোহেল চন্দ্র রায় (২১) বলেন, মা জেলে। তিনি প্রতিবন্ধী ছোট বোনকে নিয়ে এখন চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তার মা দিনমজুরি করে আয় করতেন এবং সংসার চালাতেন। টাকা নেই তাই মাকে দেখার জন্য কারাগারেও যেতে পারিনি।

বড়ভিটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খয়বর আলী জানান, গ্রেফতারকৃত দিনমজুররা সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাদের সরলতাকে পুঁজি করে প্রতারক চক্র তাদের সর্বনাশ করেছে। তিনি তদন্ত সাপেক্ষে দিনমজুরদের মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান।

ফুলবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তদন্ত সারওয়ার পারভেজ জানান, শ্রীপুর থানা আমাদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে এবং আসামি আমাদের ফুলবাড়ী উপজেলায় হওয়ায় ৪ আসামিকে গ্রেফতারে সহযোগিতা করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *