ঈদের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে খামারিদের  দুশ্চিন্তা 

নিউজ দর্পণ, ঢাকা: সর্বাগ্রাসী করোনার মধ্যেই ঘনিয়ে আসছে মুসলমানদের অন্যতম সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। ঈদের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে পশু কোরবানি নিয়ে ততই বাড়ছে অনিশ্চয়তা। স্বাভাবিক কারণেই দুশ্চিন্তা দানা বাঁধছে খামারিদের মধ্যে। সারা বছর যারা সর্বস্ব বিনিয়োগ করে পশু লালন-পালন করেছেন, নিজেরা খেয়ে না খেয়ে গৃহপালিত পশুকে খাইয়েছেন তাদের চোখে মুখে এখন রাজ্যের অনিশ্চয়তা, মাথায় ভর করেছে দুশ্চিন্তার পাহাড়।

কোরবানিদাতারা আদৌ কোরবানি করতে পারবেন কি না, হাট-বাজারগুলো আগের মতো মিলবে কি না, নিজের লালন-পালন করা পশুগুলো শেষ পর্যন্ত বিক্রি করতে পারবেন কি না, বিক্রি করতে পারলেও উপযুক্ত মূল্য পাবেন কি না এ ধরনের হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে খামারিদের মনে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লাখেরও বেশি খামারি গরু মোটাতাজা করে থাকেন। কোরবানির প্রাণী হিসেবে বিক্রি করার জন্য গত বছর সারা দেশে অন্তত এক কোটি ১৮ লাখ প্রাণি লালন-পালন করা হয়েছিল। এখনো পর্যন্ত সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও চলতি বছরে সংখ্যাটি এর কাছাকাছি হওয়ার কথা। কিন্তু বিক্রির যে পরিস্থিতি তাতে এ বছর অর্ধেক প্রাণীই অবিক্রীত থেকে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ দিকে রাজধানীসহ সারা দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণরোধে আসন্ন ঈদুল আজহায় সীমিত পরিসরে কোরবানির পশুর হাট বসবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো: তাজুল ইসলাম। তিনি জানান, স্থানীয় সরকার বিভাগের সব প্রতিষ্ঠান এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে তাদের এলাকার বাস্তবতার আলোকে সীমিত পরিসরে কোরবানির পশুর হাট ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অনলাইনে কোরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোরবানির পশুর হাটে লোক সমাগমের সম্ভাবনা বেশি থাকে। এতে করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কাও বেশি।

মন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তবায়ন দেখা যায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সিদ্ধান্তেও। স্থায়ী-অস্থায়ী মিলে এ বছর দুই সিটিতে হাট বসবে মোট ১২টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল তিন গুণেরও বেশি। অবশ্য এর আগে মোট ২৭টি হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দুই সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে দক্ষিণে ১৫টি এবং উত্তর সিটিতে ১২টি। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে দুই সিটি করপোরেশন। উত্তর সিটি অস্থায়ী ছয়টি হাট দরপত্র আহ্বান করেও শহরের ভেতরে হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বাতিল করেছে। একইভাবে দক্ষিণ সিটিও ৮টি হাট না বসানোর ব্যাপারে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

হাটের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং করোনাজনিত স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিয়ে কড়াকড়ির কারণে এ বছর টাকার বন্দোবস্ত হলেও পশু কিনতে পারবেন কি না সন্দেহ খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা আমিনুল হকের। গতকাল তিনি  বলেন, এমনিতেই আয়-রোজগার নেই। তার ওপর করোনার কারণে এবার হাটে যেতে পারি কি না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রতি বছর একাই একটি গরু কোরবানি করে আসছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এবার যদি উপযুক্ত শরিকদার পাই তবে কোরবানি দেবো, নইলে দেবোই না।

অস্ট্রেলিয়া থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে দেশে এসে গরুর খামার করেছেন উদ্যমী তরুণ মোহাম্মদ আলী শাহীন। রাজধানী ঢাকার আশপাশে রয়েছে তাদের ১৮টি গরুর খামার। করোনার কারণে তাদের পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে জানিয়ে মেঘডুবি এগ্রো নামক খামারের এ মালিক বলেন, সারা বছর লালন-পালন করতে গিয়ে গরুকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার দিতেই হয়। গরুগুলো যতটা বড় হওয়ার ইতোমধ্যে তা হয়েছেও। চাইলেও আর বাড়ানো যাবে না। কিন্তু এ ওজন ধরে রাখতে হলে তাদেরকে নিয়মিত খাবার দিয়ে যেতে হবে। কাজেই ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে চাইলে গরুগুলো বিক্রি করতেই হবে। কিন্তু বাজারের যে অবস্থা তাতে অর্ধেক পশুও বিক্রি হবে কি না সন্দেহ!

আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে প্রাণিসম্পদ খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গরু ও গাভী পালন থেকে কৃষকদের আয় প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে এবং ব্যবসায়ীদের বিক্রি কমেছে ৪২ শতাংশ। গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, পোষাপ্রাণীর খাবারের স্বল্পতা ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেক খামারি গবাদি পশুগুলোর খাবার কমিয়ে দিয়েছেন, যা প্রাণিসম্পদের সঠিক বেড়ে ওঠায় মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।
কোভিড-১৯ প্রভাব ফেলেছে প্রাণিসম্পদ খাতে ঋণ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়ের ওপরও। সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী জুনের শেষ অবধি ঋণের কিস্তি শিথিল করা হয়েছে, অর্থাৎ জুন পর্যন্ত ঋণগ্রহীতা কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে সেটিকে খেলাপি বা বিরূপমানে শ্রেণীকরণ করা যাবে না। দেশের ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ হলো গবাদি পশুর খামারিদের জন্য ঋণ। এই স্বল্পমেয়াদি ঋণগুলো সাধারণত গবাদিপশু বিক্রির পরে পরিশোধ করতে হয়। আসন্ন কোরবানি ঈদে খামারিদের গরু বিক্রি নিয়ে যে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে তার পাশাপাশি এখন ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ ঋণখেলাপি হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

করোনার কারণে নিয়ন্ত্রিত হাট বসানো প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো: আতিকুল ইসলাম বলেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে এবার ডিএনসিসি এলাকার হাট সংখ্যা কমানো হয়েছে। আর যেসব এলাকায় হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সেসব এলাকা ঘন জনবসিতপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, কোরবানির পশুর হাট থেকে যেন করোনা সংক্রমণ না ঘটে, সেজন্য সব হাটে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *