স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখানে করে পুনঃনির্বাচনের দাবি বিএনপির

নিউজ দর্পণ, ঢাকা: মঙ্গলবার সারাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফল প্রত্যাখানে করে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। আজ বুধবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের কেন্দ্রীয় দফতরের দায়িত্বে থাকা সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স এই দাবি জানান।
এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, গতকাল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও উপ-নির্বাচনে সরকার তাদের দলীয় সন্ত্রাসীদের দিয়ে বরাবরের মতোই ভোটকেন্দ্র থেকে বিএনপি’র এজেন্টদের বের করে দেয়া, ভোটকেন্দ্র দখলসহ ব্যালট পেপারে গণহারে সিল মারা, জালভোট প্রদান ও সাধারণ ভোটারদের ভোট দিতে প্রচন্ড বাধা দিয়েছে। একতরফাভাবে সরকারদলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করতেই সরকার এধরণের অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। বিএনপি’র সমর্থক ও ভোটারদের ওপর হামলা এবং ব্যাপক ভোট জালিয়াতির আশ্রয় নিলেও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকার অনুগত প্রশাসন সেসব দেখেও না দেখার ভান করেছে। এসব অনিয়ম, ভোট জালিয়াতি ও পেশী শক্তির বিষয়ে অভিযোগ করা হলেও রিটার্নিং কর্মকর্তারা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।

তিনি বলেন, বিএনপি মনোনীত প্রার্থীসহ অন্যান্য প্রার্থীদের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া এবং সাধারণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা প্রদানসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ব্যাপক তান্ডবের ঘটনায় দেশের নির্বাচনী পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক মৃতপ্রায় চেহারা আরও ষ্পষ্ট হয়েছে। সারাদেশে ধানের শীষের গণজোয়ার সহ্য করতে না পারার জন্যই সন্ত্রাসীরা নির্বাচনে ভোট জালিয়তিসহ ধানের শীষের সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদের ভয় পাইয়ে দিতে হামলা চালিয়েছে। বরাবরের মতো নির্বাচনকে একতরফা করতেই গতকাল সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে এই ধরণের ভোট সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। গতকাল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে সরকারদলীয় সন্ত্রাসীদের দ্বারা ঘৃন্য পন্থায় ভোট জালিয়াতিসহ সন্ত্রাসী কার্যকলাপের ঘটনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ধিক্কার জানাচ্ছে, নিন্দা জানাচ্ছে। এসব হামলায় আহত নেতাকর্মীদের আমরা দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি এবং হামলার সাথে জড়িত সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানাচ্ছি।
গতকাল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচন এবং ইউনিয়ন পরিষদ উপ-নির্বাচনের চিত্র এখন আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
উপজেলা নির্বাচন ও উপ নির্বাচন-২০২০
দিনাজপুর সদর, নওগার মান্দা উপজেলা, যশোর সদর, খুলনার পাইপগাছা, বাগেরহাটের শরনখোলা উপজেলা, মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা, কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা ও চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণে গতকাল অনুষ্ঠিত সকল উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা প্রশাসনের সহায়তায় ধানের শীষের সকল এজেন্টদের মারধর করে বের করে দিয়ে নিজেরাই প্রকাশ্যে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে সিল মেরেছে। সাধারণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও উপ নির্বাচন-২০২০
লালমনিরহাট জেলাধীন গড্ডিমারী ইউনিয়ন, দলগ্রাম ইউনিয়ন, পাটিকা পাড়া ইউনিয়ন; রংপুর জেলাধীন চন্দনপাট ইউনিয়ন; গাজীপুর জেলাধীন নাগরী ইউনিয়ন; ফরিদপুর জেলাধীন কোরকদি ইউনিয়ন; বরিশাল জেলাধীন কলসকাঠী ইউনিয়ন; ময়মনসিংহ জেলাধীন শেরপুর ইউনিয়ন, বালিয়ান ইউনিয়ন, সিরাজগঞ্জ জেলাধীন পোরজানা ইউনিয়ন; পাবনা জেলাধীন মন্ডতোষ ইউনিয়ন, ভাঙ্গুড়া ইউনিয়ন, চুয়াডাঙ্গা জেলাধীন গড়াইটুপি ইউনিয়ন, ডাউকী ইউনিয়ন; সিলেট জেলাধীন লক্ষীপাশা ইউনিয়ন, সাদীপুর ইউনিয়ন; হবিগঞ্জ জেলাধীন শাহজাহানপুর ইউনিয়ন; কুমিল্লা জেলাধীন আদ্রা ইউনিয়ন; চাঁদপুর জেলাধীন মেহের দক্ষিণ ইউনিয়ন, সুলতানাবাদ ইউনিয়ন, জহিরাবাদ ইউনিয়ন, সাচার ইউনিয়ন, গোহট উত্তর ইউনিয়ন; লক্ষীপুর জেলাধীন ইছাপুর ইউনিয়ন, কেরুয়া ইউনিয়ন, চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন; চট্টগ্রাম জেলাধীন সুয়াবিল ইউনিয়ন, নানুপুর ইউনিয়ন, আদুনগর ইউনিয়ন এবং হারামিয়া ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখলে নিয়ে বিএনপি’র প্রার্থীদের এজেন্টদের বের করে দিয়েছে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। অধিকাংশ ইউনিয়নে সরকারদলীয় সশস্ত্র ক্যাডারবাহিনী বিএনপি’র সমর্থক ও ভোটারদের ওপর হামলা চালিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ফলে সাধারণ ভোটার’রা ভোট দেয়া দুরের কথা, ভোটকেন্দ্রেই আসতে পারেনি।
বিএনপির ইে নেতা বলেন, গতকাল দেশের যেসব এলাকায় স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সেসব নির্বাচনে সরকারদলীয় সন্ত্রাসীদের ব্যাপক তান্ডব, ভোট সন্ত্রাস ও নানা অপকর্মের ফলে এটি আরেকবার সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশন সরকারের ঠুটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে। বরাবরের মতোই গতকালের স্থানীয় নির্বাচনগুলোতেও সরকারদলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নির্লজ্জ। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও নিজেদের স্বাধীন স্বত্তা বিকিয়ে দিয়ে সরকারের অঙ্গ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি গতকাল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখান করছে এবং পূণ: তফশিল ঘোষনার মাধ্যমে নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু পূণ:নির্বাচনের জোর দাবি জানাচ্ছে। এসব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোট ডাকাতি ও জালিয়াতির প্রতিবাদে গতকাল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংশ্লিষ্ট জেলায় আজ যে প্রতিবাদ/বিক্ষোভ/মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষনা করেছেন সেসকল কর্মসূচিতেও স্থানীয় প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের সন্ত্রাসীরা ব্যাপক বাধা প্রদান করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে জনগণের ক্ষোভ ও প্রতিবাদ প্রকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে বরং জনগণের সেন্টিমেন্টের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার আহবান জানাচ্ছি।
সংবাদ সম্মেলনে এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ ঢাকা-৫ এবং নওগাঁ-৬ আসনের উপ-নির্বাচনগুলোতে ভোট ডাকাতিসহ সারাদেশে অব্যাহত গুম, খুন, নারী-শিশু ধর্ষণ ও দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্দ্ধগতির প্রতিবাদে বিএনপি’র কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ফেনীর ফুলগাজী, চট্টগ্রামের আনোয়ারাসহ বিভিন্ন উপজেলায় শান্তিপূর্ণভাবে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল চলাকালে আওয়ামী যুবলীগ-ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা কর্মসূচিগুলোতে হামলা চালিয়ে কর্মসূচি পন্ড এবং নেতাকর্মীদের গুরুতর আহত করে। এইসব সন্ত্রাসী ঘটনার আমরা তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও ধিক্কার জানাচ্ছি। অবিলম্বে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি করছি। গত ১৯ অক্টোবর বিকেলে নারায়ণগঞ্জে রুপসী খন্দকার বাড়ীতে বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনা এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য এ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে অতর্কিতে সশস্ত্র আওয়ামী যুবলীগ-ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা অনুষ্ঠানের অতিথি নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও ডাকসু’র সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য এ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে গুরুতর আহত করে। হামলায় আরও ৩০ জন আহত হন। সন্ত্রাসীদের দ্বারা পরিকল্পিত এই ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনায় আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি করছি।
সারাদেশে অব্যাহত নারী ও শিশু ধর্ষণ, দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি ও সরকারী নানা ব্যর্থতা আড়াল করতেই সরকার দেশব্যাপী বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসহ বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর দলীয় সন্ত্রাসীদের দিয়ে বেপরোয়া হামলা ও নির্যাতন-নিপীড়ণ অব্যাহত রেখেছে। তবে এসব হামলা ও নির্যাতন চালিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্রোতধারাকে স্তিমিত করা যাবে না। বরং যেকোন মূহুর্তে জনগণ রাজপথ কাঁপিয়ে অবৈধ ও ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের পতন ঘটাতে ধেয়ে আসবে।
বিএনপির এই নেতা জানান, বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী সম্প্রতি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ল্যাব এইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। বর্তমানে তিনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত ও স্থিতিশীল অবস্থায় আছেন। আমরা তাঁর আশু রোগমুক্তি কামনা করছি। পাশাপাশি দেশবাসীর প্রতিও তাঁর দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া চাইছি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জনাব রুহুল কবির রিজভীকে সুস্থতা দান করুন-এই দোয়া করি। এছাড়াও আমাদের বেশ কিছু নেতাকর্মী যারা করোনা ভাইরাসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদেরও দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *