লকডাউনে দুই টোল প্লাজাতে ৭০ কোটি টাকা কম আয়

নিউজ দর্পণ, ঢাকা: করোনায় আয়–রোজগার হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে মানুষ। ব্যবসায়ী হারিয়েছেন পুঁজি। রাষ্ট্রও কম হারায়নি এই অতিমারিতে। শুধু বঙ্গবন্ধু ও মেঘনা–গোমতী সেতুর টোল থেকেই সরকার ৭০ কোটি টাকার বেশি আয়বঞ্চিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু সেতুটি সরকারের সেতু বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। এই সেতুর আয় থেকেই বছরে গড়ে আড়াই শ কোটি টাকা দাতাদের ঋণ পরিশোধ করা হয়। টোলের আয়ে সেতুর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণও চলে। এমনকি টোলের আয় থেকে সেতু বিভাগের অন্য খরচও বহন করা হয়।

বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণে ব্যয় হয় ৩ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা অর্থায়ন করে।

অন্যদিকে মেঘনা–গোমতী সেতু দুটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের। জাপানি সংস্থা জাইকা নব্বইয়ের দশকে সেতু দুটি নির্মাণ করে। সম্প্রতি দুই লেনের পরোনো দুটি সেতুর পাশে আরও নতুন দুটি সেতু নির্মাণ করেছে জাপান। মেঘনা–গোমতী দুটি সেতুর টোল আদায় হয় এক স্থান থেকে। আদায় করা টোল সরকারের ঘরে চলে যায়। আর দাতাদের ঋণ শোধ করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।

বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, লকডাউনের আগে মার্চে ৫০ কোটি টাকার কিছু বেশি টোল আদায় হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতি মাসে গড়ে এমনই আয় হয়ে থাকে। এপ্রিল ও মে—এই দুই মাসে মোট আয় হয়েছে ৬৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ এই দুই মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় আয় কম হয়েছে ৩৫ কোটি ২৫ লাখ টাকার মতো। জুন থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায় স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

এ বিষয়ে সেতু বিভাগের সচিব মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, দুই মাস কিছুটা আয় কম হলেও এখন স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। ঋণের কিস্তি দেওয়ার জন্য যে পরিমাণ টাকা দরকার, তা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। কারণ, আগের জমানো টাকাও রয়েছে। লকডাউনের ক্ষতি বড় কোনো সমস্যা করবে না।

তবে সওজ সূত্র জানায়, মেঘনা–গোমতী সেতুতে জুনেও টোল আদায় স্বাভাবিক হয়নি। জুলাই থেকে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। সেতুটির টোল আদায়–সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এপ্রিল, মে ও জুন—এই তিন মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় ৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা কম টোল আদায় হয়েছে।

ফলে করোনার কারণে দেশের দুটি প্রধান সড়কের ওপর নির্মিত সেতুতে ৭০ কোটি ৪২ লাখ টাকা কম টোল আদায় হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষের সূত্র জানায়, লকডাউনের কারণে এপ্রিল ও মে—এই দুই মাস তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জুন থেকে তাদের আয় বেড়ে গেছে। কারণ হিসেবে কর্মকর্তারা বলছেন, লকডাউনের মধ্যেই উত্তরবঙ্গের কাঁচামাল, আমসহ ফলমূল ও গবাদিপশু পারাপার অব্যাহত ছিল। মে–জুনের শুরুতে গণপরিবহন চালু করার পর যানবাহন আরও বেড়ে যায়। এ ছাড়া বন্যার কারণে আরিচা–নগরবাড়ী নৌপথে যাতায়াত দুরূহ পেড়ে। এ জন্য মালবাহী যান সেতু দিয়ে বেশি পারাপার করেছে। এ জন্যই জুন থেকে আয় ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

সেতু বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, স্বাভাবিক সময়ে বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে গড়ে সাড়ে পাঁচ লাখ যানবাহন যাতায়াত করে। এপ্রিল–মে মাসের লকডাউনের সময় যানবাহন পারাপারের সংখ্যা সাড়ে চার লাখে নেমে আসে।

অন্যদিকে মেঘনা–গোমতী সেতু দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে এটিকে দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন মনে করা হয়। স্বাভাবিক সময়ে এই সেতু দিয়ে দিনেই গড়ে ৩১ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করে। লকডাউনের সময় তা কমে দাঁড়ায় সাড়ে ২১ হাজারের মতো।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ সামছুল হক বলেন, লকডাউনের কারণে ৭০ কোটি টাকা কম টোল আদায় হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর জন্য একটা ধাক্কা। কিন্তু সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে, কোভিড–১৯ পুরো দেশের অর্থনীতির ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, টোল থেকে এর একটা চিত্র পাওয়া যায়। গাড়ি কম চলার অর্থ হচ্ছে মালামাল কম পরিবহন হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কম হয়েছে। মানুষের যাতায়াত কম হওয়ার অর্থ সে অলস বসে ছিল। আসলে একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িয়ে আছে। এর একটা চেইন রিঅ্যাকশন আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *