মালয়েশিয়ায় অবৈধ কর্মীর ৪১% বাংলাদেশী

নিউজ দর্পণ, ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশটিতে প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশী কর্মরত, যাদের বড় অংশই শ্রমিক। বিভিন্ন কারণে তাদের উল্লেখযোগ্য অংশই অবৈধভাবে অবস্থান করছেন। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, মালয়েশিয়ায় অবৈধ হয়ে পড়া বিদেশী কর্মীর ৪১ শতাংশই বাংলাদেশী।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে মালয়েশিয়ায় গিয়ে যারা অবৈধ হয়েছেন, তাদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ সেখানে গিয়েছিলেন ট্যুরিস্ট ভিসায়। ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে যেসব বিদেশী মালয়েশিয়ায় যান, সেখানে তাদের থাকার সুযোগ নেই। তবুও তারা সেখানে থেকে যাচ্ছেন। দেশটির আইন অনুযায়ী, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকরা ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়ে মালয়েশিয়ায় ৩০ দিনের বেশি অবস্থান করতে পারবেন না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আসিয়ানের সদস্য নয় এমন দেশগুলোর নাগরিকরাও অন অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা নিয়ে মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থান করেছেন। এসব নাগরিকের বেশির ভাগ ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার। এ কারণে মালয়েশিয়া সরকার ২০১৯ সালে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, চীন, নেপাল ও মিয়ানমারের নাগরিকদের অন অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে।

মালয়েশিয়ার উন্নয়ন অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০১৬ সালের মার্চ থেকে একটি গবেষণা শুরু করে বিশ্বব্যাংক। চলতি বছরের এপ্রিলে ‘হু ইজ কিপিং স্কোর? এসটিমেটিং দ্য নাম্বার অব ফরেন ওয়ার্কার্স ইন মালয়েশিয়া’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয়। সেখানে দেখানো হয়, মালয়েশিয়ার টেকসই অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রয়েছে বিদেশী শ্রমিকদের। দেশটির লেবার ফোর্স সার্ভের তথ্য ব্যবহার করে এতে বলা হয়, সেখানে প্রায় ২২ লাখ ৭০ হাজার বিদেশী কর্মী বিভিন্ন খাতে কর্মরত। সে হিসেবে দেশটিতে অবৈধভাবে কর্মরত প্রায় ১২ লাখ বিদেশী শ্রমিক। যদিও দেশটিতে কর্মরত প্রতি ১০ জন বিদেশী শ্রমিকের মধ্যে চারজনই অবৈধভাবে সেখানে অবস্থান করছেন।

গবেষণাটি করতে গিয়ে বিশ্বব্যাংক মালয়েশিয়ার প্রায় ৩০ লাখ বিদেশী কর্মীর ওপর জরিপ করে। জরিপে অংশ নেয়া বিদেশী কর্মীর সাড়ে ১২ লাখ অবৈধভাবে সেখানে অবস্থান করছেন।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশীদের ৪১ শতাংশই গিয়েছেন বাংলাদেশ থেকে। এর পরই ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের অবস্থান। দেশটিতে অবৈধ কর্মীর ৩০ শতাংশ ইন্দোনেশিয়ার, ১২ শতাংশ ভারতের, ফিলিপাইনের ৬ শতাংশ ও নেপালের ৫ শতাংশ। অবৈধ কর্মীদের মধ্যে ২ শতাংশ করে গিয়েছেন পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার থেকেও। এছাড়া শ্রীলংকা ও থাইল্যান্ড থেকে প্রবেশ করা কর্মীরাও মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থান করছেন।

২০০৭ সালেই মালয়েশিয়ায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ জন বিদেশী অন অ্যারাইভাল সুবিধা নিয়ে দেশটিতে গিয়েছিলেন, যারা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সেখানে অবৈধভাবে অবস্থান করেছেন। একই সঙ্গে তারা সেখানে থেকে কর্মসংস্থানের চেষ্টাও করেছেন। বৈধতা না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালায় দেশটির ইমিগ্রেশন পুলিশ, যা থেমে থাকেনি নভেল করোনাভাইরাসের কারণে চলা লকডাউনের সময়ও।

এদিকে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে অন্য দেশের মতো মালয়েশিয়ার অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতির শিকার। ফলে স্থানীয় কর্মীদের কাজের পরিধি বাড়াতে প্রবাসী কর্মী কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। এর ধারাবাহিকতায় কাজ হারিয়ে অবৈধ হয়ে পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন আরো অনেক বিদেশী কর্মী। কাজের ক্ষেত্র আরো সংকুচিত হয়ে আসায় বাংলাদেশীদের জন্য এ আশঙ্কা আরো বেশি। কারণ অনেক বাংলাদেশীই সেখানে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, যেগুলো পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে কাজ করছেন অনেক বাংলাদেশী।

মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের পরিসংখ্যান বলছে, মালয়েশিয়া অবৈধদের অধিকাংশই অদক্ষ ও স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিক। এরা দেশটির নিম্নমানের যেসব পেশা রয়েছে সেসব পেশায় কাজ করেন। এ অদক্ষ শ্রমিকদের মধ্যে বড় অংশ প্রতিবেশী দেশ ইন্দোনেশিয়া, নেপাল ও বাংলাদেশের। এ অনিয়মিত কর্মীদের মধ্যে অনেকেই দেশটির মধ্যে পলিয়ে রয়েছেন। এর মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি রয়েছে। মালয়েশিয়া সরকার এ অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধতা দিতে ‘জিরো ইরেগুলার মাইগ্রেশন বাই ২০২০’ পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। এর আগের অনিয়মিত কর্মীদের বৈধতা প্রদানে সিক্স পি প্রোগ্রাম নামে একটি কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। তবে উদ্যোগটি তেমন কোনো কাজে আসেনি। এ অনিয়মতি শ্রমিকদের শনাক্তে দেশটির আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে শত শত অনিয়মিত শ্রমিক ধরা পড়ছেন। ভিসা-পাসপোর্টের মেয়াদ না থাকায় এসব শ্রমিকের দিন কাটছে অনেকটা আতঙ্কে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ায় গেছেন প্রায় এক লাখ কর্মী। ২০১৮ সালেও দেশটিতে গেছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার ৯২৭ কর্মী। ওই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশী কর্মী নেয়া বন্ধ হয়ে যায়। গত বছর দেশটিতে গেছেন মাত্র ৫৪৫ জন।

প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) নির্বাহী পরিচালক ড. সি আর আবরার বলেন, মালয়েশিয়া বিভিন্ন সময়ে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে অবৈধ শ্রমিকদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে, যার মাধ্যমে অনেকে ফিরেছেন। আবার সাম্প্রতিক সময়ে কাজ হারিয়ে ভিসা নবায়ন না হওয়ায় অনেকে অবৈধ হচ্ছেন। অবৈধদের ক্ষেত্রে বলা হয় তারা ‘আনডকুমেন্টেড’ ছিল, তাহলে কেন ‘আনডকুমেন্টেড’ ছিল সেটি খুঁজে দেখতে হবে।

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলছে, দীর্ঘ নিয়োগ প্রক্রিয়া ও অধিক অভিবাসন খরচ হওয়ায় প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে অবৈধ হওয়ার হার বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক মালয়েশিয়াকে প্রস্তাব করেছে, প্রবাসী কর্মীদের জন্য অভিবাসন নীতি তৈরি করলে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে আরো এগিয়ে যেতে পারবে এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলো তাদের সহযোগিতায় আরো এগিয়ে আসবে। মালয়েশিয়া প্রতিনিয়ত উন্নত হলেও তাদের শ্রমবিষয়ক সুযোগ-সুবিধা অপরিবর্তিত রয়েছে। তারা স্বল্পদক্ষ প্রবাসীদের ওপর তুলনামূলক কাজের অনেক চাপ প্রয়োগ করে। দেশটির উৎপাদন খাতে শ্রম উৎপাদনশীলতা কমেছে। কিন্তু প্রবাসী শ্রমিকরা কম মজুরি পেয়েও শ্রম ঘাটতি পূরণ করেছেন এবং কঠোর পরিশ্রম করে মালয়েশিয়ার অর্থনীতিকে সচল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে থাকা অনেকেই সেখানে আশ্রয় (অ্যাসাইলাম) প্রার্থনা করেছেন বলেও বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউএনএইচসিআরের তথ্য উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার রিফিউজি মালয়েশিয়ায় অ্যাসাইলাম প্রার্থনা করেছেন। মিয়ানমার থেকে যাওয়া আনুমানিক ১ লাখ ৪১ হাজার ৭০০ জন অ্যাসাইলাম প্রার্থনা করেছেন, যার মধ্যে ৮১ হাজার ৭৬০ জন রোহিঙ্গা। পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, সিরিয়া, শ্রীলংকা, আফগানিস্তান এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে গিয়েও মালয়েশিয়ায় অ্যাসাইলাম প্রার্থনা করেছেন ২১ হাজারের বেশি মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *