বোয়ালের আন্ডা বোয়ালে ভাঙ্গে

নিউজ দর্পণ, ঢাকা: পবিত্র কোরান শরীফে আল্লাহপাক বলেছেন যে, “তোমরা যা গোপন কর, আল্লাহর অভিপ্রায় হলো তা প্রকাশ করা।” কোরান শরীফের বক্তব্য লংঘন বা খন্ডন হওয়ার প্রমাণ অদ্যবদি পাওয়া যায় না। যে কোন ঘটনা বা অপরাধ অতি গোপনে করলেও তা প্রকাশ হয়ে যায় এবং ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় যে, নির্মম সত্যটি নিজের লোকের মাধ্যমেই প্রকাশ পায়। এটাও সৃষ্টি কর্তার একটি কৌশল হতে পারে।

অতিসম্প্রতি বসুরহাট পৌরসভার মেয়র ও আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী আবদুল কাদের মির্জা অতি সহজ সরলভাবে আঞ্চলিক ভাষায় বলেছেন, “এদেশে কি ভোট ডাকাতি বন্দ অইত নয়, অইবো-অইবো। গত নির্বাচনে শেখ হাসিনা চাইছে ফল। আংগো দেশে কিছু দুর্নীতিবাজ আমলা আছে, কিছু দুর্নীতিবাজ নেতা আছে-হেগুনে শেখ হাসিনারে গাছসহ দিয়ালাইছে। চাইছে ফল, গাছসহ দিয়ালাইছে হেগুনে। হিয়েন কইলে হয়তো আাঁর ছাকরিও থাইকতোন। হিয়েন আঁই কই দিছি।” (এ দেশে কী ভোট ডাকাতি বন্ধ হবে না, হবে – হবে। গত নির্বাচনে শেখ হাসিনা চেয়েছেন ফল। আমাদের দেশে কিছু দুর্নীতিবাজ আমলা আছে, কিছু দুর্নীতিবাজ নেতা আছে- এরা শেখ হাসিনাকে গাছসহ দিয়েছে। চেয়েছে ফল, তারা দিয়েছে গাছসহ। সেসব বললে হয়তো আমার চাকরিও থাকবে না। কিন্তু আমি বলে দিলাম।) আওয়ামী লীগ নেতা ফেনীর জয়নাল হাজারী আঃ কাদের মির্জার বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (দক্ষিণ) মেয়র ও প্রাক্তন মেয়র একজন আর একজনের বিরুদ্ধে দূর্ণীতির অভিযোগ এখন প্রকাশ্যে চলছে মিডিয়াতে। কে কতটুকু দূর্নীতি করেছেন এটা তদন্ত করার এখতিয়ার আমার নাই, তবে ইবধঁঃু ড়ভ ঃযব ঝযড়ি হলো একই দলের একজন আর একজনের আন্ডা ভেঙ্গে গোমর ফাস করে দিচ্ছেন। কে সত্য বা কে মিথ্যা বলছেন তা আলোচনা মূখ্য বিষয় নহে, বিষয়টি হলো গৃহবিবাদ এখন ক্ষমতাসীনদের নিজেদের মধ্যে।

প্রতিদিনই মিডিয়াতে সরকারের দূর্নীতির কথা প্রকাশ পাচ্ছে। যেমন-২১টি প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে খরচ দেখানো হচ্ছে ২,৮১৫/- (দুই হাজার আটশত পনের কোটি) টাকা। মিডিয়ার মতে পরামর্শক নিয়োগে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। সরকারের এমন কোন সেক্টর নাই যেখানে দূর্নীতি হচ্ছে না। সরকারী ভাষ্য মতে দেশে এখন কোন প্রকার খাদ্যের অভাব বা ঘাটতি নাই। তবে কেন বিদেশ থেকে চাউল আমদানী হচ্ছে? সরকারের শরীক দলের এম.পি রাশেদ খাঁন মেনন দাবী করেছেন যে, দেশে করোনা কালে ৪০ ভাগ মানুষ ১১.৪ শতাংশ ধনী বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোপূর্বেই আমরা বলেছি যে, দেশের নিম্ন মধ্যবিত্ত বা শ্রমজীবি মানুষগুলি দিন দিন নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। যার ছিল ১০ বিঘা সম্পত্তি সংসারের ঘানি টানতে টানতে সে হয়েছে নিঃস্ব, অন্যদিকে যার ছিল ২০০ বিঘা জমি, সে হয়েছে ১০০০ বিঘা জমির মালিক।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহা সড়ক বেয়ে দূর্বার পতিতে এগিয়ে যাচেছ। ইট, বালু, সিমেন্টের যৌথ প্রণয়নকে প্রধানমন্ত্রী উন্নয়ন বুঝে থাকেন তবে তাহার মন্তব্য যথার্থ। আর যদি গণমানুষের উন্নয়নে বুঝিয়েছেন তবে তাকে নিরপেক্ষ মানসিকতা নিয়ে আরো গভীরে প্রবেশ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর চলা ফেরার ঝঢ়বপরধষ সিকিউরিটি থাকে, তিনি একজন রাজনীতিবিদ ও দলীয় প্রধান, তিনি যদি বাংলাদেশে ছদ্দবেশে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেন তবে দেখতে পারবেন দেশের মানুষ কতটুকু শান্তিতে আছে? তবে একশ্রেণীর লোক সূখে শান্তিতে আছে যারা আপনার দল করে এবং আমলারা যারা মনে করে যে আপনাকে ক্ষমতায় বসানো ও ক্ষমতায় টিকে থাকার পিছনে তাদের অবদান সবচেয়ে বেশী। বাকী লোকেরা রয়েছে নির্যাতন নিপীড়নের মধ্যে যারা সরকারী দল করে না বরং বিরোধী দলের সাথে সম্পৃক্ত। আপনার দলের লোকেরা কারো জমি দখল করেছে, কারো বাড়ী দখল করেছে, দোকান দখল করেছে এবং আরো কত কি ঘটনা। এসব ঘটনার অবশ্যই অবসান হওয়া দরকার। নতুবা ইতিহাসের পাতা যেমন কাউকে ক্ষমা করে নাই এবং আপনাকে করবে না।

পত্রিকা খুললেই দেখা যায় যে, ছাত্রলীগ যুবলীগে মারামারি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর উপস্থিতিতে সরকার দলীয়দের নিজেদের মধ্যে সন্ত্রাসী হামলা। সব কিছুই ঘটছে হালুয়া রুটির জন্য, বাংলাদেশে যা সহজে প্রাপ্য, অর্থাৎ সরকারী দল হলেই হাট, ঘাট, টেন্ডার, নিয়োগ বানিজ্য সবই এখন সরকারী দলের পকেটস্থ। বিরোধী দল বনাম সরকারী দলে কোন ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া এখন লক্ষ্য করা যায় না, সবই হয় এখন একতরফা, কারণ প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে কোন ঝঢ়ধপব দিচ্ছেন না। তার সকল ক্ষমতা তিনি বিরোধী দলীয় রাজনীতিকে কবর দেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।

সড়ক ও সেতু মন্ত্রী সরকারী দলের সাধারণ সম্পাদক সহ তিনিও দলের মূখপাত্র হিসাবে প্রতিদিন বিরোধী দল অর্থাৎ বিএনপি’র বিরুদ্ধে বিষেদাগার করে যাচ্ছেন। এমন কোন দিন নাই যে দিন ঘরে বসেই বিএনপি’র দোষ ধরে টিপ্পনী কাটছেন না। অথচ নিজ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের প্রতি তিনি উদাসীন। একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ যে, “২০২০ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৭৩৫টি। নিহত ৫৪৩১ জন এবং আহত ৭৩৭৯ জন। নিহতের মধ্যে নারী ৮৭১, শিশু ৬৪৯। ১৩৭৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১৪৬৩ জন। দুর্ঘটনায় ১৫১২ জন পথচারী নিহত হয়েছে। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৬৩৮ জন। বেসরকারী সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বছরব্যাপী১১৯টি নৌদুর্ঘটনায় ২৭২ জন নিহত, ১৩৭ জন আহত এবং নিখোঁজ ৬২ জন। ১০৮টি রেলপথ দুর্ঘটনায় নিহত ২২৮ এবং আহত ৫৪ জন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে ০.৮৯ শতাংশ, প্রাণহানি বেড়েছে ৪.২২ শতাংশ এবং অহতের মাত্রা বেড়েছে ৩.৮৮ শতাংশ (সূত্র ০৯/০১/২০২১ তারিখের জাতীয় পত্রিকা)।

ধর্ষন অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদন্ড দেয়ার বিধান করে শেখ হাসিনা সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন আইন সংশোধন করেছেন। তার পরও কি গণহারে ধর্ষন বন্ধ হয়েছে? সরকার সর্বক্ষেত্রকে ডিজিটাল করেছেন। উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েদের হাতে হাতে মোবাইল। আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে সকল প্রকার যৌনাচার এখন ছেলে মেয়েদের অতান্তপ্রিয়। একশ্রেণীর বুদ্দিজীবিদের বদৌলতে দেশ দিন দিনে ধর্মহীনতার দিকে যাচ্ছে। সংস্কৃতিক অংগনে ধর্ম বিরোধী কথা বার্তা উষ্কানিমূলক। তারাই দেশকে ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিবর্তে ধর্মহীন সমাজ গড়ার সফল হয়েছে, ফলে মৃত্যুদন্ডের আইন পাশ হলেও ধর্ষন বন্ধ হচ্ছে না। ধর্ষন বন্ধ করার প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে ধর্মহীনের পরিবর্তে ধর্মীয় মূল্যবোধের সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকারকে পাঁচ মিশালী চিন্তা করলে চলবে না, বরং মানুষের মন মগজে চিন্তার পরিবর্তন আনতে হবে যা শুধু ফুলের উপঠোকনের উপর নির্ভর করলে চলবে না, দরকার হবে একটি বাস্তব সম্মত পরিকল্পনার। সরকারের স্বেচ্ছাচারিতার কাহিনী সম্পর্কীত অনেক লেখাই পত্রিকায় স্থান পাচ্ছে। তবে স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধের কোন উদ্দোগ সরকারের নাই। উদ্বেগ রয়েছে সাফাই গাওয়ার।

যে কথা দিয়ে শুরু করে ছিলাম তা হলো বোয়ালের আন্ডা বোয়ালে ভাঙ্গে। অর্থাৎ জনবিরোধী কর্মকান্ড যতই গোপনে করা হউক না কেন তা প্রকাশ হয়ে যায় নিজেদের মধ্যে থেকেই। আব্দুল কাদের মির্জা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের আপন ছোট ভাই। কাদের মির্জা এবং ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে আকাশ পাতাল ডিফারেন্স। আবদুল কাদের মির্জা স্থানীয় পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে আসন্ন নির্বাচনেও প্রার্থী। জনাব ওবায়দুল কাদের সরকারের অত্যান্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি এবং প্রতিদিনই মিডিয়াতে দেখা যায়। কিন্তু আঃ কাদের মির্জার একটি বক্তৃতায়ই তিনি জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন, অন্যদিকে মিডিয়া প্রিয় ওবায়দুল কাদের সাড়া দিন রাত্রি মিডিয়াতে বলে যাচ্ছেন অথচ জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন কি?

প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানগণসহ দেশরক্ষা বাহিনীর প্রধান যারা নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সকলেই বলেছেন নির্বাচন সুষ্ঠ হয়েছে এবং অতি উৎসাহীত হয়ে তাদের মধ্যে একজন বলেই দিয়েছেন যে, এরকম সুষ্ঠ নির্বাচন তিনি ইতিপূর্বে দেখেন নাই। একটি সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি’র পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছে যে, এ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে আরো সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরিচালনা করা হবে। আঃ কাদের মির্জার বক্তব্য মতে নির্বাচনে ডাকাতি হয়েছে এবং তিনি আশা প্রত্যাশা করেন যে, একদিন ভোট ডাকাতি বন্ধ হবে। নির্বাচন কমিশন সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভোট ডাকাতদের যে প্রশংসা করেছে এবং আগামীতে তাদের মতে আরও সুষ্ঠ নির্বাচন করার প্রত্যাশার নিকট জাতির প্রত্যাশা কি বিলীন হয়ে যাবে?

লেখক

অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার

সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *