বনানীতে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন রফিক-উল হক

নিউজ দর্পণ, ঢাকা: বনানীতে স্ত্রীর পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন প্রথিতযশা আইনজীবী ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক।

আজ শনিবার বিকেল ৩টায় বনানী কবরস্থানে স্ত্রী ডা. ফরিদা হকের কবরের পাশে ব্যারিস্টার রফিক-উল হককে সমাহিত করা হয়। এর আগে তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটের দিকে জ্যেষ্ঠ এ আইনজীবীর নামাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজায় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা, মৎস্য ও পশু সম্পদমন্ত্রী শ. ম রেজাউল করিম, রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন, ঢাকা দেিণর মেয়র ফজলে নূর তাপস, অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরুসসহ শত শত আইনজীবী অংশগ্রহণ করেন।
জানাজা শেষে তার মরদেহে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির প থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়। এছাড়া, বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের প থেকেও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতাল জামে মসজিদে ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর এ আইনজীবীর মরদেহ নেয়া হয় তার পল্টনের বাসায়। সেখান থেকে দুপুর সোয়া ১২টায় মরদেহ নেয়া হয় বায়তুল মোকাররমে। জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তার দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ এ আইনজীবী (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। আদ-দ্বীন হাসপাতালের মহাপরিচালক ডা. অধ্যাপক নাহিদ ইয়াসমিন তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
রক্ত শূন্যতা ও প্রস্রাবের সমস্যাসহ বার্ধক্যজনিত জটিলতা দেখা দেয়ায় গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে।

শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন ছিলেন সাবেক এ অ্যাটর্নি জেনারেল। কিন্তু গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) তিনি কিছুটা সুস্থবোধ করলে সকালের দিকে রিলিজ নিয়ে বাসায় ফিরে যান। এরপরে দুপুরের পরপরই ফের তাকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে।

জানা গেছে, রক্তশূন্যতা, ইউরিন সমস্যাসহ বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন প্রবীণ এই আইনজীবী। তিনি ডা. রিচমন্ড রোল্যান্ড গোমেজের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর আগে গত জুনে ডায়াবেটিকের পরিমাণ কমে যাওয়ায় শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তখনও আদ-দ্বীন হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেণে ছিলেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। তখন তিনি পল্টনের বাসায় অবস্থান করেই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

২০১৭ সালে বাম পায়ের হাঁটুতে অস্ত্রোপচারের পর থেকে তার চলাফেরা সীমিত হয়ে পড়ে। এ কারণে গত ৩ বছর ধরে তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেননি। বয়োবৃদ্ধ খ্যাতিমান এ মানুষটির জীবনের শেষ সময়গুলোর বেশিরভাগই কেটেছে বিছানায় শুয়ে। চলাফেরা করতেন হুইল চেয়ারে।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯০ সালের ৭ এপ্রিল থেকে একই বছরের ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের ষষ্ঠ প্রধান আইন কর্মকর্তা (অ্যাটর্নি জেনারেল)।

তিনি ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে এলএলবি পাস করেন। ১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্য থেকে বার এট ল’ সম্পন্ন করেন তিনি। ১৯৬৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে এবং ১৯৭৩ সালে আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে আইন পেশা শুরু করেন তিনি। বর্ণাঢ্য জীবনে আইন পেশায় দীর্ঘ প্রায় ৬০ বছরেরও বেশি সময় পার করেছেন।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাজ করেছেন। বিগত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুই নেত্রী যখন কারাগারে তখন তাদের জন্য অকুতোভয়ে আইনি লড়াই করেছিলেন তিনি। একইসঙ্গে দুই নেত্রীর সমালোচনা করতেও পিছপা হননি তিনি। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ভাবমূর্তি রায় বরাবরই সোচ্চার ছিলেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *