প্রেমিক-প্রেমিকা সেজে সড়কে ঘুরে ঘুরে ছিনতাই

নিউজ দর্পণ, চট্রগ্রাম: চট্টগ্রাম নগরে একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন নাছির, রাজু ও সেলিম। মঙ্গলবার (১৭ নভেম্বর) রাত ৮টার দিকে নগরের জয় পাহাড়ের ভেতর দিয়ে তারা কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরছিলেন। সার্সন রোডে সিজিএস স্কুলের পাশা আসা মাত্রই সিএনজি অটোরিকশা থেকে নেমে সেলিমের পথ রোধ করেন এক তরুণী। এ সময় কিছু বুঝে উঠার আগেই অপর এক তরুণ সেলিমের বুকে, পেটে ও উরুতে ধারালো ছোরা দিয়ে জখম করেন। এরপর তার মোবাইল ফোন নিয়ে আবারও অটোরিকশা যোগে পালিয়ে যান ওই তরুণ-তরুণী।
গত প্রায় ৩ দিনে চট্টগ্রাম নগরে এরকম অন্তত ৭টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে দুটি ঘটনায় গুরুতর জখম হয়ে দুজন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। দুটি ঘটনাতেই নগরের কোতোয়ালী থানায় মামলা হয়েছে। অভিযোগ পেয়ে মঙ্গলবার রাতভর অভিযান চালিয়ে নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৩ ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার ছিনতাইকারীদের মধ্যে দুই নারী ও ৫ কিশোর রয়েছে।
এদিকে কোতোয়ালি থানার রহমতগঞ্জ এলাকায় সংঘটিত একটি ছিনতাইয়ের ঘটনার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখা যায়, আগের ঘটনার মতই এক তরুণী সিএনজি অটোরিকশা থেকে নেমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। মোবাইল হাতে এক পথচারী পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ ওই তরুণী পথচারীকে সামনে থেকে আগলে ধরতেই তার সঙ্গে থাকা আরেক তরুণ ছোরা দিয়ে পথচারীকে আঘাত করতে থাকেন। এক পর্যায়ে গুরুতর জখম পথচারীর হাত থেকে মোবাইলটি ছিনিয়ে নিয়ে ওই তরুণ-তরুণী পালিয়ে যান।
অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) পলাশ কান্তি নাথ বলেন, স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে আমরা ছুরিকাঘাতে আহত যুবককে হাসপাতালে পাঠাই। পরে খোঁজ নিতে গিয়ে ওই সিসিটিভি ফুটেজ আমাদের হাতে আসে।
তিনি বলেন, প্রথমে বিষয়টি দেখে আমাদের কাছে মনে হয়, এটি কোনো নারীঘটিত ঘটনা। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, এটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দেয়ার কৌশল। এর প্রেক্ষিতে আমরা অপরাধীদের ধরতে অভিযান শুরু করি। অভিযানে গিয়ে প্রথমে ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়। যার কাছ থেকে ফোনটি উদ্ধার হয়, তাদের দেয়া তথ্যে আমরা একটি গ্রুপকে ধরি। ওই গ্রুপে এক নারীসহ চার পুরুষ সদস্য আছেন। ধারণা খরি, ওই ঘটনার সঙ্গে তারাই জড়িত। কিন্তু তদন্ত এগুতে থাকলে আমরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারি। অর্থাৎ, অপরাধের মূল হোতারা তখনও অধরা।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসিন জানান, গত ১৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরের গনি বেকারি মোড়ে ছিনতাইয়ের শিকার হন অরবিন্দু দত্ত নামে এক ব্যক্তি। এ সময় ছিনতাইকারীরা তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। গতকাল রাত ৮টার দিকে নগরের চকবাজারের সার্সন রোড দিয়ে যাওয়ার সময় মো. সেলিম নামে আরও এক ব্যক্তি ছিনতাইয়ের শিকার হন। এ ঘটনাতেও ভুক্তভোগীর বুক, পেট ও উরুতে ছোড়া দিয়ে মারাত্মক জঘম করে ছিনতাইকারীরা।
মোহাম্মদ মহসিন বলেন, এ দুটি ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ করা হলে ঘটনা তদন্তে নামে পুলিশ। তথ্য-প্রযক্তির সাহায্যে ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন ক্রয়কারী শনাক্তের পর প্রথমে নগরের সিরাজউদ্দৌলা রোড থেকে রুবেল ও তার স্ত্রী ফারজানা বেগমকে এবং তাদের দলের আরও তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আন্দরকিল্লা রাজাপুকুর লেন থেকে পাঁচ কিশোর ছিনতাকারীকে গ্রেফতার করা হয়।
তিনি আরও বলেন, তাদের গ্রেফতারের পরও গতকাল রাত ৮টার দিকে নগরের চকবাজারের সার্সন রোডে ছিনতাইয়ের শিকার হন মো. সেলিম। এ ঘটনায় বিচলিত হয় পুলিশ। পরে আবারও তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে রাত ৮টার দিকে নগরের স্টেশন রোড থেকে ছিনতাইকারী রাকিবুল হাসান রাকিব (২৫) ও তার সহযোগী রুপা প্রকাশ নিপাকে (২০) গ্রেফতার করা হয়।
সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) নোবেল চাকমা জানান, পুলিশি অভিযানে গ্রেফতার রাকিব ও নিপা দুজন বন্ধু। ছিনতাইয়ের সূত্রেই তারা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গত এক বছর ধরে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই করে বেড়াতেন। প্রেমিক-প্রেমিকা পরিচয়ে সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া নিতেন তারা। এরপর শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বিভিন্ন ব্যক্তিকে টার্গেট করতেন নিপা। সুবিধা মতো কাউকে পেয়ে গেলে তাকে টার্গেট করে তিনি সিএনজি থেকে নেমে পড়তেন। এরপর টার্গেট ব্যক্তিকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করে আটকে রাখার চেষ্টা করতেন নিপা। এই ফাঁকে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে মোবাইল ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতেন রাকিব। ভুক্তভোগী মোবাইল ফোন দিতে না চাইলে ছুরিকাঘাত করে ছিনিয়ে নিতেন।
কোতোয়ালি থানা কম্পাউন্ডে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে নিপা ও রাকিবের কথা হয়। এ সময় তারা জানান, গত কয়েক দিনে ছুরিকাঘাত করে ও ভয় দেখিয়ে সাতজনের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়েছেন তারা। রাকিব বলেন, ‘ভয় লাগালে কেউ কেউ মোবাইল দিয়ে দেয়। কিন্তু যারা মোবাইল দিতে চায় না তাদের ছুরি দিয়ে খোঁচা দিই।’
নিপা বলেন, ‘ওই ছেলেগুলো (নাছির, রাজু ও সেলিম) রাকিবের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করছিল। তাই তাদের ছুরি মেরে দিয়েছে।
সহকারী পুলিশ কমিশনার নোবেল চাকমা বলেন, রাকিব এক সময় চকবাজার এলাকার ছিঁচকে চোর ছিলেন। প্যারেড মাঠে খেলতে আসা ছেলেদের মোবাইল চুরি করতেন। পরে নিপাদের সঙ্গে মিলে ছিনতাই শুরু করেন রাকিব। কিন্তু নিপা এর আগে তার মামা সুমনের সঙ্গে মিলে নগরীতে অনেক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েছেন। নিপার মামা সুমন নগরের মুরাদপুরে এক দারোয়ানকে ছুরিকাঘাত করে জেলে আছেন। এরপর থেকে রাকিবের সঙ্গে ছিনতাই শুরু করেন নিপা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *