পুলিশই রাজা, তবে ঠেলার নাম বাবাজী

নিউজ দর্পণ, ঢাকা: মিডিয়ার ভাষ্যমতে, “অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা প্রায় এক মাস ধরে কক্সবাজারে অবস্থান করায় সংশ্লিষ্ট সব মহলের কাছে অপরিচিত ছিলেন না। অনেকবার তিনি শাপলাপুর চেকপোস্ট অতিক্রম করেছেন পুলিশের বিনা বাধায়। সূত্র মতে, তিনি কক্সবাজারের প্রাকৃতিক দৃশ্যের ভিডিও চিত্র সংগ্রহের পাশাপাশি তার চোখে ধরাপড়া টেকনাফ পুলিশের মাদক কারবার সম্পর্কেও বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। তার এই ভূমিকায় দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হন ওসি প্রদীপসহ তার পালা দুর্বৃত্ত চক্র। তাই সিনহাকে শেষ করার পরিকল্পনা আগে থেকেই নিয়েছিলেন ওসি প্রদীপ। শুধু অপেক্ষা করছিলেন সুযোগের। সেই মতে ঈদের সময়ে অর্থাৎ ৩১ জুলাই রাতের অন্ধকারে সিনহাকে পেয়ে পরিকল্পিতভাবে ক্রসফায়ারের নির্দেশ দেন প্রদীপ।

শুধু তাই নয়, গুলি করার পর ওসি প্রদীপ দ্রুত থানা থেকে এসে গুলিবিদ্ধ সিনহার দেহ থেকে প্রাণ বের হচ্ছিল এমন অবস্থায় লাথি মেরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এরপর সিনহার সেই ভিডিও, সেই তথ্য ধ্বংস করে দেন। ওসি প্রদীপ সর্বশেষ এক ভিডিও বার্তায় ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে টেকনাফকে মাদকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘গায়েবি হামলা হবে বাড়ি ঘরে, গায়েবি অগ্নিসংযোগ হবে।’ প্রদীপের এই ঘোষণার পর ঈদের দিন বেশ কিছু বাড়ি ঘরে হামলা চালানো হয় এবং খুরেরমুখ এলাকায় সড়কের পাশে উঠিয়ে রাখা বেশ কিছু জেলে নৌকায় (ফিশিংবোট) অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং শতাধিক বাড়ি ঘরে অগ্নিসংযোগ হামলা চালিয়ে ভাংচুর করা হয়। এ সময় চলে ব্যাপক চাঁদা আদায়। এখানে সেখানে পাওয়া যায় গুলিবিদ্ধ লাশ। সর্বশেষ গত ২৮ দিনে ১১টি বন্দুক যুদ্ধে উখিয়ার জনপ্রিয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বখতেয়ারসহ কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হয় ২২ জনকে।

২৯ জুলাই হোয়াইক্যং ইউনিয়নের আমতলী এলাকার আনোয়ার হোসেন (২৩), পূর্ব মহেষখালীয়া পাড়ার আনোয়ার হোসেন (২২), নয়াবাজার এলাকায় ইসমাইল (২৪) ও খারাংখালী এলাকার নাছিরকে ধরে নিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করে রাতে মেরিন ড্রাইভ সড়কে নিয়ে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ সম্পন্ন করে। ওই দিন কক্সবাজার ঝাউবাগান থেকে পাওয়া যায় গুলিবিদ্ধ অপর এক যুবকের লাশ। ওসি প্রদীপ আগে এবং পরে মাদক নির্মূলের ঘোষণা দিয়ে যতগুলো কথিত বন্দুকযুদ্ধের কথা বলেছেন সব ক’টিতে ইয়াবা তথা মাদক, অস্ত্র ও হত্যা তিনটি মামলা এন্ট্রি করত। এসব মামলায় এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। তারপর শুরু হয় গ্রেফতার বাণিজ্য। মামলার চার্জশিট থেকে আসামি বাদ দেয়া এবং চার্জশিটে নাম দেয়ার ভয় দেখিয়ে আদায় করা হয় কোটি কোটি টাকা। মাসে শত কোটি টাকা উপার্জন করে ওসি প্রদীপ। তথ্য মতে, প্রদীপের বিরুদ্ধে পুলিশ হেডকোয়াটারে অনেকবার চাঁদাবাজি, স্বামীকে আটকে স্ত্রীকে ধর্ষণ, ইয়াবার নামে ব্যবসায়ীদের হয়রানি, মিথ্যা মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে কোটি টাকা আদায় ইত্যাদি বহু অভিযোগ গেছে, কিন্তু পুলিশ হেডকোয়াটার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি” (সূত্র: জাতীয় পত্রিকা, তাং- ৭/৮/২০২০ ইং)।

পুলিশ কর্তৃক মেজর (অব:) রাশেদ সিন্হা নির্মম ভাবে নিহত হওয়ার পর সরকার দায়সারা গোছের তদন্ত কমিটি গঠন করে, যা সচারাচর করে থাকে, কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন আর আলোর মূখ দেখে না, এটাই হলো বাংলাদেশের তদন্ত সংস্কৃতি। বড়জোর পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা, পরে সুবিধামত পোষ্টিং। মেজর সিন্হার বিষয়টি নিয়ে যখন হই চই বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে রাওয়া ক্লাবে সেনাবাহিনীর প্রাক্তন অফিসারদের বৈঠকে সুষ্ট বিচারের দাবীতে আর্টিমেটাম ও জনরোষের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তদন্ত কমিটি পরিবর্তন করে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রামকে প্রধান করে সেনাবাহিনী ও পুলিশ প্রতিনিধি সমন্বয়ে পুনরায় একটি তদন্ত পুন: কমিটি গঠন করেছেন। উভয় বাহিনীর প্রধানগণ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে যৌথ বিবৃতি দিয়ে বলেছেন যে, “এ হত্যার দায় বাহিনীর নহে, বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির।” সরকারের মূখপাত্র ও সেতুমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বিবৃতি দিয়ে নিজেদের শিকড় অনেক গভীরে উল্লেখ করে সরকার পরিবর্তনের বিষয়টি কারো মাথায় যেন না আসে সে জন্য প্রচ্ছন্ন একটি হুমকি প্রদান করেছেন, রাজনৈতিক দলগুলি বক্তব্য দেয়ার পূর্বে “ঠাকুর ঘরে কে রে? উত্তরে আমি কলা খাই না” সূচক বক্তব্য দিয়ে সংগঠিত বিষয়ে সরকারের টনক নড়ার বিষয়টিই প্রকাশ পেয়েছে।

এ ধরনের ঘটনায় সরকারের টনক নড়া জনগণের জন্য মঙ্গলজনক। তবে এ ধরনের ন্যাঙ্কারজনক ঘটনা ঘটার পূর্বেই যদি সরকারের কান সজাগ থাকতো তবে এ জাতীয় ঘটনা কমে আসতো। শুনা যায়, ওসি প্রদীপ ইতোপূর্বে ১৪৪টি ক্রস ফায়ার করেছে যা থেকে ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার সহ অনেক ভালো মানুষ, সাংবাদিক কেহই রক্ষা পায় নাই। দায়িত্ব নিয়েই বলা যায় যে, এতোগুলি হত্যার জন্য সরকার ইতোপূর্বে আদৌ কি কোন তদন্ত করেছিলেন? নাকি ক্রস ফায়ার দেয়াটার জন্য পুলিশকে সরকার ব্ল্যাঙ্ক চেক প্রদান করেছে? মাদকের যেমন প্রসার ঘটেছে, মাদক কারবারের পুলিশের সম্পৃক্ততা নতুন কোন ঘটনা নহে, মাদক ব্যবসায় ধরা পড়ে অনেক পুলিশ এখনো জেলখানায়। মাদকের গড ফাদার উপাধি পাওয়া সরকারী দলের জাতীয় সংসদ সদস্য বদিকে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার কারণে ২০১৮ সনের নির্বাচনে নমিনেশন না দিয়ে তার স্ত্রীকে দেয়া হয়েছে। অথচ মাদক গড ফাদার বদির সাথে ওসি প্রদীপকে (ফাইল ছবিতে) একজন সূবোধ বালকের মতই সিভিল ড্রেসে পাশাপাশি বসে থাকার ছবি মিডিয়াতে প্রকাশ পেয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কি শুধু টেকনাফেই পুলিশের রাজ রাজত্ব না দেশের অন্য কোথাও আছে? বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান বলেছিলেন, “মাছের রাজা ইলিশ, দেশের রাজা পুলিশ।” উক্ত কথাটির প্রতিফলন রয়েছে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় এবং প্রতিটি থানায়।

পুলিশ এতো ক্ষমতা পেলো কোথায়? তারা এখন সরকারী দলের সাধারণ নেতাদেরও কোন প্রকার পাত্তা দেয় না, পাত্তা দেয় তাদের যাদের সাথে উপর তালার সরাসরি কানেকশন রয়েছে। ওসি প্রদীপের একটি ভিডিও বার্তা ভাইরাল হয়েছে। হ্যান্ড মাইকে ওসি প্রদীপ রাজনৈতিক নেতাদের ভঙ্গিতেই ঘোষণা দিয়েছে যে, “গায়েবি হামলা হবে বাড়ি ঘরে, গায়েবি অগ্নিসংযোগ হবে।” “গায়েবি” কথাটি বর্তমান আওয়ামী সরকারের আমলেই রাজনীতির সুবাদে পুলিশী সংস্কৃতিতে চালু হয় ২০১৮ ইং সালে। ০৮/০২/২০১৮ ইং তারিখ বিএনপি চেয়ারপার্সনকে সাজা দিয়ে কারাগারে প্রেরনের পূর্বেই দেশব্যাপী যাহাতে আন্দোলন সংগ্রাম না হতে পারে এ জন্য সরকারী নির্দেশনায় ২০১৮ ইং সনের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই প্রতি থানায় বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থদের নামে গায়েবী মোকদ্দমা শুরু করে যা অব্যাহত থাকে ২০১৮ জাতীয় নির্বাচনের রেস সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত। এ গায়েবী মামলা থেকে শুধু বিএনপি নেতাকর্মী নহে বরং সরকারী দলের দৃষ্টিতে তাদের যারা সমর্থন করবে না বলে মনে হয়েছে তাদেরকেও আসামী করা হয়েছে।

এতে মৃত ব্যক্তি, পঙ্গু, ভিক্ষুক কেহই বাদ যায় নাই। এ গায়েবী মামলা দিয়ে প্রতিপক্ষকে বাড়ী ঘর ছাড়া করা হয়েছে, জেলে আটক রাখা হয়েছে, পুলিশ রিমান্ড বানিজ্য করেছে, মিথ্যা মামলা জেনেও জেলা ও দায়রা জজ পর্যন্ত গায়েবী মামলায় জামিন দেয় নাই, হাই কোর্ট থেকে জামিন নিতে হয়েছে, একটা মামলায় জামিন হলে আরেকটি গায়েবী মামলায় ঢুকিয়েছে। তখন আগাম জামিন নেয়ার জন্য শত শত মানুষ কোর্টের বারান্দায় ভিড় জমাতো। কতবড় লজ্জা ও দু:ক্ষের কথা এই যে, রাষ্ট্রীয় বেতন ভুক্ত কর্মচারীরা জনগণের বেতন খেয়ে গায়েবী মামলা দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগণকে জেলে ঢুকিয়েছে, ঘটনা ঘটে নাই এমন গায়েবী (কাল্পনিক) ঘটনা সাজিয়ে মামলা দিয়েছে। সরকার নিজেই পুলিশকে গায়েবী মামলা অর্থাৎ মিথ্যা বলার লাইসেন্স দিয়েছে, সে লাইসেন্স পুলিশ এখন নিজেদের স্বার্থে অর্থ উর্পাজনে ব্যবহার করছে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কি আছে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুলিশের প্রভাব এখন বহুমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ ভোটার বিহীন ২০১৮ ইং সনের কথিত নির্বাচনে সরকারকে ক্ষমতায় বসানোর পিছনে পুলিশের একক কৃতিত্ব রয়েছে বলে তাদের দাবী। কোন কোন পুলিশ অফিসার প্রকাশ্যেই এ ধরনের মন্তব্য করে। পুলিশের এ ধারনা থেকেই গায়েবী মামলার পরে এখন গায়েবী হামলা ও গায়েবী অগ্নিসংযোগের প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছে, লুট করছে প্রভৃতি। পুলিশে এ ধরনের প্রদীপ, লিয়াকত শুধু টেকনাফে নহে বরং দেশব্যাপী সর্বত্র। দুদক অনেক বড় বড় কথা বলে। কিন্তু পুলিশের প্রশ্নে নিরব নিস্তব্দ। এখন দুদক বলছে যে, ২০১৮ সনে ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করা হয়েছিল।

এখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠে, কার আঙ্গুলী নির্দেশে মাঝ পথে দুদকের তদন্ত থেমে গিয়েছিল? কেহ ধরা পড়লেই দুদক তদন্ত শুরু করে। দুদকের নিজস্ব উদ্দ্যোগে কি তদন্ত করার বিধান নাই? বাংলাদেশের কোন ডিপার্টমেন্টেই ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না, বিষয়টি কি দুদক জানে না? নাকি পুলিশী প্রভাবের নিকট দুদকও পরাস্ত? প্রবাদ রয়েছে যে, “চৎবাবহঃরড়হ রং নবঃঃবৎ ঃযবহ পঁৎব.”

১৯৯৭ ইং সনে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী থাকাবস্থায় কর্মরত একজন কারারক্ষীকে রাতভর তাহাজ্জতের নামাজ পড়তে দেখেছি। পুলিশে ভালো লোক একে বারে নেই তা বলা যাবে না। কিন্তু অনেক পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছে যাদের অত্যাচারে সংশ্লিষ্ট এলাকা তটস্থ। প্রতি থানায় পুলিশের দালাল বাহিনী রয়েছে, তারা অপরাধী ধরার সোর্স হিসাবে ব্যবহ্নত না হয়ে কোথা থেকে কি করলে অবৈধ অর্থ আদায় হবে সে সোর্স হিসাবে ব্যবহ্নত হয়ে আসছে। ইয়াবা সেবনকারীর সংখ্যা এক দিকে যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে পুলিশের চক্ষুশুল হলেই ইয়াবা দিয়ে ধরিয়ে দেয়ার ঘটনাও বিরল নহে। এ ধরনের ঘটনা মিডিয়াতে যা আসে তাহাই দেশবাসী জানে। অন্যগুলি ধামা চাপা পড়ে যায়, বিনা দোষে অনেকেই জেল খাটে দিনের পর দিন।

গ্রাম অঞ্চলে একটি প্রবাদ রয়েছে যে, “ঠেলার নাম বাবাজী।” প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠন “রাওয়া ক্লাব” যদি এগিয়ে না আসতো তবে মেজর সিন্হার ক্রস ফায়ারকে বৈধতা দেয়া ছাড়াও তার সহযোগী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ছাত্রীদের বিনা জামিনে কনভিকশন মাথায় নিয়েই দীর্ঘদিন জেলখাটতে হতো। উঠতি বয়সেই আইনী প্রক্রিয়ায় তাদের কপালে কলঙ্কের রাজটীকা লাগিয়ে দিতো, অন্ধকার হয়ে যেতে সম্ভবনাময় ভবিষ্যত, পরিবারগুলি সমাজ কর্তৃক হতো ধিকৃত, আশাভরসার স্থলে হতাশায় তাদের বুকে চির ধরে যেতো, সন্তানদের পরিচয় গৌরবের না হয়ে হতো অপমানের। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে কয়টি ঘটনার তদন্তের আলোর মূখ দেখেছে? মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার হওয়ার পূর্বে কোন রাষ্ট্রীয় সংস্থা কোন দিন স্বউদ্যোগে প্রতিকারের কোন ব্যবস্থা নিয়েছে কি? বরং খুন করার পরও মিথ্যা মামলা কি ভাবে সাজানো যায় তার টেলিফোনে পরামর্শ দিচ্ছেন সাবেক পুলিশ সুপার। দৃশ্যত মনে হচ্ছে মিথ্যা মামলা সাজানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পুলিশ সর্বোচ্চ ট্রেনিং প্রাপ্ত। কক্সবাজারের বর্তমান পুলিশ সুপারও একই ভূমিকা পালন করেছে। মনে হচ্ছে যে, ও.সি’কে খুশী রেখেই এস.পি’কে চলতে হয়।

১/১১ সরকারের সময়ে দেখা গিয়েছে যে, মাসধিকাল আটক রেখে পরে থানায় গ্রেফতার দেখানো হতো। ধরে নিয়ে যাওয়া হতো এ জায়গা থেকে অথচ গ্রেফতার দেখানো হতো অন্যকোন থানায়। কোন কোন ক্ষেত্রে নারী কেলেঙ্কারীতে জড়িয়ে দেয়া পর্যন্ত হুমকি দেয়া হয়েছে।

ঞযব চড়ষরপব অপঃ’ ১৮৬১ প্রনয়নের মাধ্যমে জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা তথা দুষ্টের দমন ও সুষ্টের পালনকে উদ্দেশ্য করে ১৮৬১ ইং খৃষ্টাব্দে আইনগত ভাবে এই উপমহাদেশে পুলিশ বাহিনী গঠন করা হয়। জনগণের জীবন, সম্পদ, সম্মান, জীবিকা, প্রভৃতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশের সংবিধান। পুলিশের অনেক অতি উৎসাহী কর্মকর্তার রাজনৈতিক আচরন তাদের প্রমোশন ও লোভনীয় পোষ্টিং এর বিষয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। রাজনীতিবিদেরা ক্ষমতায় বসেই প্রতিপক্ষকে দমন পীড়নের জন্য পুলিশ তোষন শুরু করে, ফলে তাদের (পুলিশ) জিব্বা বড় হতে হতে এতো বড় হয়েছে যে, ছোট খাট রাজনৈতিক নেতাদের এখন আর তারা তোয়াজ করে না, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নীচে তাদের কোন প্রটোকল আছে বলে তারা মনে করে না। তবে বদলী হওয়ার ভয়ে স্থানীয় এম.পি’দের সকল বায়না পূরণ করে, বিশেষ করে এম.পি’দের অবৈধ কার্যকলাপ বিনা বাধায় করার সহযোগী হিসাবে।

জনগণকে এখন দু’ধরনের ট্যাক্স দিতে হয়। একটি সরকারী ট্যাক্স, অপরটি এম.পি বাহিনী ও পুলিশী ট্যাক্স। ফুটপাতের ফেরী ওয়ালা, বেবীটেক্সী, টেম্পো ষ্ট্যান্ড থেকে শুরু করে জুয়ার আসর, মদের আসর, হোটেলের অবৈধ নারী ব্যবসা, ফেনসিডিল ব্যবসা, হাট বাজার পর্যন্ত এমন কোন ক্ষেত্র নাই যেখানে জনগণকে সরকারী ট্যাক্স এর পাশাপাশি বেসরকারী ট্যাক্স দিতে হয় না, বেসরকারী ট্যাক্স না দিলেই পুলিশী হয়রানী এবং হয়রানী কি ও কত প্রকার তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেহ আচ করতে পারে না। প্রবাদ রয়েছে যে, চাকুরীর মধ্যে বড় চাকুরী হলো ডি.সি ও ও.সি’র চাকুরী। কারণ ও.সি সমস্ত থানাকে শাসন করে, ও.সি’দের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ডি.সি’দের ছিল, কিন্তু বর্তমানে ডি.সি’দের সে ক্ষমতাও নাই।

রাজনীতিবিদেরা জেলায় পুলিশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুলিশের নিকটেই হস্তান্তর করেছে। ফলে তারাই এখন তাদের নিয়ন্ত্রন করছে। যাদের উপর তালায় সরাসরি কানেকশন আছে সে সকল পুলিশ অফিসারগণ তাদের উপরস্ত কর্মকর্তাদের মান্য না করারও অনেক অভিযোগ শোনা যায়। ক্রস ফায়ারের ভয় দেখিয়ে পুলিশের চাদাবাজী এখন নিত্য নৈমত্তিক খবরে প্রকাশ পাচ্ছে। বিষয়গুলিতে সরকারের বোধদয় হওয়ার সময় এখনো কি হয় নাই? তবে বাংলাদেশের পুলিশ অনেকগুলি জটিল মামলা ডিটেকট করতে পেরেছে, আবার অনেকগুলি করে নাই, এর পিছনেও রাজনৈতিক প্রভাব বিদ্যমান। পুলিশ বাহিনীকে জনগণের আস্থার জন্য সময়ে সময়ে বিভিন্ন কলা কৌশলের কথা সরকারের দায়িত্ব প্রাপ্তদের মূখে শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে পুলিশ জনগণের আস্থা কতটুকু অর্জন করতে পেরেছে? তা কি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহল চিন্তা করে দেখছেন?

পুলিশকে যেহেতু ক্ষমতা দখল রাখার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয় সেহেতু অতিউৎসাহী পুলিশ তো ফায়দা লুটবেই। প্রমাণ হয়েছে যে পুলিশ জনগণের আস্থায় নয় বরং সরকারের আস্থায় থাকে। প্রতিবাদী জনগণ যারা নিজ সাংবিধানিক অধিকার আদায়ের জন্য রাস্তায় নামে তখন তাদের ঠেঙ্গানো ও গায়েবী মামলায় কারাবন্দী রাখার জন্য পুলিশের চেয়ে সরকারের বিশ্বস্থ বন্ধু আর কে হতে পারে? তবে ক্ষমতার রদ বদল হলে কে কার বন্ধু তখনই উপলব্দি করা যায়। উচ্চবিলাসী পুলিশ কর্মকর্তারা আকাশ চুম্বী স্বপ্নে বিভোর, তাদের হাত এখন অনেক লম্বা হয়েছে রাজনীতিবিদদের অপরাজনীতির কারণে অর্থ সম্পদেও তারা এখন বিত্তশালী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ (এ্যাডভোকেট) বলেছিলেন যে, “যে পুলিশ আমার পাছার মধ্যে লাঠি দিয়ে বাড়ী মেরেছে, সেই এখন আমার সাথে রাজনীতি করতে চায়।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও পুলিশের সংস্কারের কথা বলছেন, তবে এটা নতুন কোন কথা নহে, কোন ঘটনা ঘটলেই জনগণকে সান্তনা দেয়ার জন্য এটা শুনতে খুব ভালো লাগে। তবে দেখা যাক, এর বাস্তবায়ন কতটুকু হয়! পুলিশকে আবর্জনা মুক্ত রাখতে না পারলে জনগণের আস্থায় আনা যাবে না। সরকার সত্যই যদি পুলিশ বিভাগকে সংস্কার করতে চান তবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা রদ বদলের জন্য পুলিশকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না। ক্ষমতাসীনরা সর্বকালেই নিরস্ত্র জনগণ দমানোর জন্য পুলিশকে ব্যবহার করে তাদেরকে বেপোয়ারা করে তোলার কারণেই সময়ে সময়ে জনগণের এই ধরনের ভোগান্তি। নিরীহ জনগণ এর পরিসমাপ্তির অপেক্ষায়।

দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে এ পর্যন্ত পুলিশ বাহিনীর ৬৬ জন সদস্য মৃত্যুবরণ করেছে। মুক্তিযুদ্ধেও তাদের ভূমিকা ছিল। পুলিশ বাহিনীতে সৎ লোক নাই, তা বলা যাবে না। তবে চেক পোষ্টে গাড়ী থামানোর ক্ষমতা পুলিশের, অস্ত্র পুলিশের, পোশাক পুলিশের, বেতন চলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে, এখন আইজিপি বলবেন দায় পুলিশের নয়, ব্যক্তি প্রদীপের, এ কথা জনগণ মানবে না, ভয়ে চুপ থাকার নাম মেনে নেয়া হয়। ঘাটে নৌকা বেধে দিন রাত দাড় টানলেও নৌকা যে তিমিরে ছিল সেখানেই ঘুরপাক খাবে, এগুবে না। পুলিশ বাহিনীতে সংস্কার যদি আনতেই হয় তবে টপ টু বটম স্ক্যানিং অপারেশন দরকার। তবেই জাতি অতিগুরুত্বপূর্ণ একটি বাহিনীর সার্বিক সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা পাবে।

লেখক

 তৈমূর আলম খন্দকার

রাজনীতিক, কলামিষ্ট ও আইনজীবি (এ্যাপিলেট ডিভিশন)

মোবাঃ ০১৭১১-৫৬১৪৫৬

E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *