পরীক্ষা ছাড়া পাস, বিরূপ মন্তব্য না করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

নিউজ দর্পণ, ঢাকা: করোনার কারণে অনুষ্ঠিত না হওয়া এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ঘোষিত ফল নিয়ে বিরূপ মন্তব্য না করতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আজ শনিবার সকাল পৌনে ১১টায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট থেকে ফল ঘোষণা করা হয়।
এর আগে গণভবন থেকে অনলানে যুক্ত হয়ে ডিজিটালি এই পরীক্ষার ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে একটি বছর নষ্ট হয়ে যাক সেটি আমরা চাইনি, এজন্য ফলাফল ঘোষণা দিলাম।
শেখ হাসিনা বলেন, ভেবেছিলাম অবস্থার পরিবর্তন হলে পরীক্ষা নিতে পারব। কিন্তু নতুনভাবে সংক্রমিত হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একই পদ্ধতিতে ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে।
দুই পরীক্ষার ফলাফল ভিত্তিতে এইচএসসির মূল্যায়নের ফল প্রস্তুত করা কঠিন কাজ ছিল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এ কাজটি করতে পেরেছেন তারা সবাই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।
এ সময় তিনি করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল নিয়ে বা ফল দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে বিরূপ মন্তব্য না করতে সবার প্রতি অনুরোধ জানান।
ফল ঘোষণার সময় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, শিক্ষা সচিব মো. মাহবুব হোসেন, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আমিনুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
করোনার কারণে অনুষ্ঠিত না হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সবাই পাস করেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮৯ পরীক্ষার্থী ছিল। এর মধ্যে এর মধ্য জিপিএ–৫ (গ্রেড পয়েন্ট এভারেজ) পেয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৮০৭ জন পরীক্ষার্থী, যা মোট পরীক্ষার্থীর ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
করোনায় পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা না হওয়ায় এসএসসি ও জেএসসির পরীক্ষার গড় ফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। জেএসসির ফল থেকে ২৫ শতাংশ এবং এসএসসির ফল থেকে ৭৫ শতাংশ নিয়ে গড় করে ফল প্রকাশ করা হয়েছে।
গত ৭ অক্টোবরে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষা সরাসরি গ্রহণ না করে ভিন্ন পদ্ধতিতে মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবারের এইচএসসি শিক্ষার্থীরা দুটি পাবলিক পরীক্ষা দিয়ে এসেছে। এদের জেএসসি ও এসএসসির ফলের গড় অনুযায়ী এইচএসসির ফল নির্ধারণ করা হবে। মুক্তিযুদ্ধের বছরের পর এবার মহামারির মধ্যে পরীক্ষা ছাড়া সব শিক্ষার্থীকে পাস করানো হল।
শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি জানান, সাধারণ ও মাদরাসা বোর্ডের ক্ষেত্রে জেএসসি ও সমমান এবং এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার বিষয়গুলোকে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ফলাফল প্রস্তুত করা হয়েছে।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ক্ষেত্রে এসএসসি ও সমমান এবং একাদশ শ্রেণির পরীক্ষার বিষয়গুলোকে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রস্তুত হয়েছে ফল।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরামর্শক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সাবজেক্ট ম্যাপিং করে ফল প্রকাশ করা হয়। সমন্বয়কৃত বিষয়ের প্রাপ্ত নম্বরের গড় মানের ভিত্তিতে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার বিষয়ভিত্তিক নম্বর প্রতিস্থাপন করে বিদ্যমান পদ্ধতিতে গ্রেড পয়েন্ট নির্ধারণের মাধ্যমে জিপিএ চূড়ান্ত করা হয়।
এছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে গ্রুপ বা বিভাগ পরিবর্তনকারী পরীক্ষার্থী, বোর্ড পরিবর্তনকারী পরীক্ষার্থী, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত পরীক্ষার্থী, অনিয়মিত পরীক্ষার্থী, মানোন্নয়ন পরীক্ষার্থী, সমতুল্য সনদপ্রাপ্ত পরীক্ষার্থী ও প্রাইভেট পরীক্ষার্থীদের ফলাফল পরামর্শক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে করা হয়।
দীপু মনি বলেন “ফলাফলে কোনো শিক্ষার্থী সংক্ষুব্ধ হলে রিভিউ চেয়ে আবেদন করতে পারবে।”

তিনি জানান, এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা না হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের ফরমপূরণ বাবদ আদায়কৃত অর্থের অব্যয়িত অংশ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “যদি মূল্যবোধ তৈরি না হয়, তাহলে শুধু বেশি নম্বর পেয়ে কী হবে, মানবিক গুণে গুণান্বিত হও; চারপাশে তাকাও- মানুষকে ভালবাসো। নীতি নৈতিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠো, স্বদেশ প্রেমে উজ্জীবিত হও, নিঃস্বার্থ চিত্তে মানব কল্যাণে নিবেদিত হও।
দীপু মনি অভিভাবকদের প্রতি বলেন, আপনার সন্তানকে অসুস্থ প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দেবেন না, স্বার্থপর হিসেবে গড়ে তুলবেন না। দেশের কল্যাণে, মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত হওয়ার শিক্ষা যদি আপনার সন্তান না পায়, মনে রাখবেন এ শিক্ষা অর্থবহ হবে না, শিক্ষার আসল উদ্যেশ্যই ব্যাহত হবে।
শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যারা শিক্ষকতা পেশায় আছেন, আপনাদের দায়িত্ব অনেক অনেক বেশি। শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনে বিষয়ভিত্তিক মানসম্পন্ন শিক্ষাদানে আপনাদের ভূমিকাই প্রধান। মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরির ক্ষেত্রেও আপনারাই রাখতে পারেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
জানা গেছে, এই মূল্যায়নের কাজটি করার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করেছে। বিভাগ পরিবর্তনজনিত (যারা বিজ্ঞান থেকে মানবিক বা অন্য বিভাগ পরিবর্তন করেছে) কারণে যে সমস্যাটি হবে তা ঠিক করতেও বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করেছে। এই বিশেষজ্ঞ কমিটি তাদের পরামর্শ বা মতামত দিয়েছে। সেই পরামর্শের ভিত্তিতে এই মূল্যায়নের ফল প্রকাশ করা হচ্ছে আজ।
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৭৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ফলাফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪৭ হাজার ২৮৬ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ২০১৯ সালে মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৯ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন ৯ লাখ ৮৮ হাজার ১৭২ জন।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এস এম আমিরুল ইসলাম বলেন, দুভাবে ফল জানা যাবে। প্রথমত যারা পূর্বঘোষণা অনুযায়ী প্রাক–নিবন্ধন করে রেখেছে, তাদের দেওয়া নির্ধারিত মোবাইল নম্বরে খুদে বার্তায় ফল জানানো হবে। এ ছাড়া বোর্ডের ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও ফল জানা যাবে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ফল জানতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই শিক্ষার্থীদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *