জিপিডির প্রবৃদ্ধি একটা রাজনৈতিক সংখ্যায় পরিণত হয়েছে:সিপিডি

নিউজ দর্পণ ডেস্ক: সদ্যসমাপ্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) যে তথ্য দিয়েছে তার সমালোচনা করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ধরনের পরিসংখ্যান দেয়ার কারণে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে এবং জিপিডির প্রবৃদ্ধি এখন একটা রাজনৈতিক সংখ্যায় পরিণত হয়েছে। এজন্য পরিসংখ্যানের সঠিক চিত্র তুলে ধরতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

আজ রোববার ‘২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাথমিক হিসাব : সিপিডির প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ অভিমত দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থাটি।

বিবিএস থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ অর্জিত হয়েছে বলে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এর আগে সিপিডির পক্ষ থেকে পূর্বাভাস দেয়া হয় ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে। অর্থাৎ সিপিডি যে পূর্বাভাস দেয় সরকারি হিসাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি তার দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতেই রোববার ভার্চুয়ালে মিডিয়া ব্রিফিংয়ে আসে সিপিডি। এই মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডির পক্ষ থেকে জিডিপির বিভিন্ন দুর্বলতার দিক তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

এর ওপর ভিত্তি করে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘জিডিপির প্রবৃদ্ধির যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়েছে। এগুলো হচ্ছে-হিসাব পদ্ধতির মধ্যে অন্তর্নিহিত দুর্বলতা রয়েছে। কারণ আমরা দেখছি, এখানে অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের ভিত্তিতে এই হিসাবটি করা হয়েছে। যার ফলে পরবর্তী তিন মাসে অর্থনীতির কী হলো তার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।’
‘দ্বিতীয় বিষয় হলো-অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হালনাগাদ নয়। তার মানে নিয়মিতভাবে সেই তথ্যগুলো আহরণ করা হয় না। অনেক তথ্য অনেক পুরানো, তার ভিত্তিতে একটা প্রাক্কলন করা হয়েছে’, বলেন ফাহমিদা।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার বিষয়ে সিডিপির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের ভিত্তিতে জিডিপির হিসাব করা হয়েছে। এই অর্থবছরে বাংলাদেশের এবং সারা পৃথিবীতের অর্থনীতিতে করোনার যে প্রভাব পড়েছে, সেই প্রভাবটা একটা ঐতিহাসিক। এটার প্রভাব সর্বব্যাপী। এই প্রভাবটা কিন্তু আমরা জিডিপির হিসাবের মধ্যে তুলে ধরতে পারলাম না।’

তিনি বলেন, আমাদের দেশে মার্চ মাস থেকে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এরপর থেকে লকডাউন দেয়া হয়েছে। সুতরাং অর্থনীতিতে এর প্রভাবটা শেষ প্রান্তিকে এসে বেশি বোঝা যায়।

প্রবৃদ্ধি নিয়ে একটা মোহ সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, এই মোহ সৃষ্টি হওয়ার কারণ প্রবৃদ্ধি রাজনৈতিকভাবেও ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি শুধু একটা সংখ্যা নয়, এর পেছনে অনেক তাৎপর্য রয়েছে। যেমন মানুষের ওপর প্রভাব, নীতিমালার ক্ষেত্রে প্রভাব। কিন্তু এখন আমরা দেখছি, এটা একটা রাজনৈতিক সংখ্যায় পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির সুফল যদি সবাই না পায়, প্রবৃদ্ধির ফলে যদি কর্মসংস্থা সৃষ্টি না হয়, দারিদ্র না কমে, বৈষ্যম না কমে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি কোনো ধরনের অন্তর্ভুক্তমূলক হয় না। সুতরাং এই সংখ্য দিয়ে যদি আমরা আমাদের সাফল্য দেখাতে চাই, তাহলে তা কোন কাজের হবে না।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা ধরে নিচ্ছি এবং বিবিএস যে কথা বলছে, সেটাই ধরে নিচ্ছি। এটা হলো ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন অর্থবছরে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কত হয়েছে। বিবিএসই বলেছে, ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। যেহেতু চতুর্থ প্রান্তিকে আমাদের একটা নেগেটিভ অবস্থা ছিল, সুতরাং প্রবৃদ্ধির তো প্রশ্নই আসে না। এটা আমরা চ্যালেঞ্জ করতে পারি। কেউ যদি বলে চতুর্থ প্রান্তিকে, গত বছরের চতুর্থ প্রান্তিকর তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা দেখেছি, জুলাই-মার্চে (২০১৯ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত) একমাত্র রেমিট্যান্স ছাড়া আমদানি, উৎপাদন, বেসরকারি খাতের ঋণ, ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ সবগুলো মিলেয়ে জুলাই-মার্চেই অর্থনীতিতে একটা স্লোথ গতি দেখছিলাম। তার পরে যোগ হয়েছে চতুর্থ প্রান্তিক। যেখানে প্রবৃদ্ধির তো প্রশ্নই আসে না। সবকিছু বেবেচনায় নিয়ে আমরা বলছি ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাস্তবতার সঙ্গে মিল খাচ্ছে না।

আরেক প্রশ্নের উত্তরে গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারের যে পরিসংখ্যানগুলো দেয়া হয়েছে সেগুলো এবং সরকার অন্যান্য যে কার্যক্রমগুলো নিচ্ছে তার সঙ্গে মিলিয়ে আমরা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলেছি।

তিনি বলেন, ‘৫ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সরকারের এই হিসাব যদি ঠিক থাকে, তাহলে কিন্তু মাথাপিছু আয় যেটি সরকার বলছে, ২০৬৪ ডলার হয়েছে এবং সেই ভিত্তিতে আপনি অনুমান করতে পারেন, বিভিন্ন সংস্থা যে হারে দারিদ্র্য বাড়ার কথা বলছে, সেই হারে বাড়ার কথা না। অথবা নতুন দারিদ্র্য সৃষ্টি হওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, সেটাও হওয়ার কথা না। যেহেতু যথেষ্ট মাত্রই প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তাহলে তো সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য সরকারের এত বড় উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না, সরকারের তথ্য-উপাত্ত যদি আমরা বিশ্বাসযোগ্যমাত্রা-ই ধরে নিই।’

‘সিপিডির পক্ষ থেকে আমরা বলছি, দারিদ্র্যের হার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত হতে পারে। সরকারও কিন্তু দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। যদি এই মাত্রায় প্রবৃদ্ধি হয়ে থাকে তাহলে তো এমন কর্মসূচি নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না’-যোগ করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *