গণমাধ্যমের কিছু পরিবেশনায় উদ্বিগ্ন

ড. তোফায়েল আহমেদ

গণমাধ্যম একটি সমাজের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সভ্যতা, শোভনতা ও রুচিশীলতার ধারক-বাহক এবং অন্যতম চালিকাশক্তি। দেশের দায়িত্বশীল ও সচেতন মানুষ বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ, তথ্য ও সংবাদভাষ্যের জন্য স্বাভাবিকভাবেই মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করে। তথ্যপ্রযুক্তির নানামুখী ব্যবহারের কারণে বিকল্প অথবা সম্পূরক হিসেবে সামাজিক গণমাধ্যম যেমন হাতের নাগালে, তেমনি রয়েছে নানা সুড়সুড়ি বা সত্য-মিথ্যার মিশেল দেয়া অনলাইন বাতায়ন, ইউটিউব প্রভৃতি। এখানে আমাদের উদ্বিগ্নতার বিষয়টি মূলধারার গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্র, টিভি, রেডিও প্রভৃতিকে নিয়ে। যতই সময় যাচ্ছে, মূলধারার গণমাধ্যমের একটা বড় অংশ দর্শক, শ্রোতা ও পাঠক চাহিদা ও রুচির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষায় অমনোযোগিতার পরিচয় দিচ্ছে। গণমাধ্যমের মধ্যে সংবাদপত্র ‘শিল্প’ (ইন্ডাস্ট্রি) হিসেবে স্বীকৃত। অন্যান্য মাধ্যম আইনগত স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকলেও বাস্তব দৃষ্টিতে তারাও শিল্প পদবাচ্য। সবাই একটি পণ্য উৎপাদন করে এবং বাজারে তা পরিবেশন করে কম-বেশি মুনাফা অর্জন করে। তার বাইরেও গণমাধ্যমের মালিক ও গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপভোগ করে নানা যশ-খ্যাতি ও প্রভাব-প্রতিপত্তি।

এ শিল্প বিশেষ কোনো পণ্য উৎপাদনের কারখানা শুধু নয়, এ শিল্প সত্যিকার অর্থে ‘শিল্পকলার’ও (আর্ট) সহোদর। গণমাধ্যম শুধু এ দুই অর্থে নয়, ইন্ডাস্ট্রি ও আর্ট দুটিকে মিলিয়েই একটি ভিন্ন ধাঁচের শিল্প। গণমাধ্যম একটি সমাজের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সভ্যতা, শোভনতা ও রুচিশীলতার ধারক-বাহক এবং অন্যতম চালিকাশক্তি। একদিকে বস্তুনিষ্ঠতা, সততা, অন্যদিকে রুচিশীল পরিবেশনা। এসব মিলিয়ে গণমাধ্যম সমাজ অগ্রগতির যোগ্য সারথির ভূমিকা পালন করে। একটি দেশ ও সমাজে জনচাহিদা অনুযায়ী সঠিক ও স্বাভাবিক তথ্যপ্রবাহ এবং তথ্য পরিবেশনায় নিজস্ব নৈতিক ও রাষ্ট্রের আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে নিজেদের মধ্যে গুণগত উত্কর্ষের প্রতিযোগিতা করে।

কিন্তু সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশে গণমাধ্যম সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে ঢালাওভাবে একজন দর্শক, শ্রোতা ও পাঠকের বিরক্তি উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। কোনো কোনো সময় রুচি বিগর্হিতভাবে বাড়াবাড়ি রকমের সীমা অতিক্রম করছে। বাংলাদেশে গণমাধ্যম প্রকাশ ও বিকাশের একটি বিস্ফোরণ ঘটেছে। গত দশকে সংখ্যা বিচারে এর বিশাল ব্যাপ্তি সত্যিকারের নীতি-নৈতিকতা, সভ্য-সংস্কৃত ও রুচিশীল পরিবেশনার ক্ষেত্রে বিপর্যয় নিয়ে আসছে কিনা, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। দুঃখজনক হচ্ছে, মূলধারার গণমাধ্যমেও বিচ্যুতির সংক্রমণ ঘটছে।

প্রিন্ট মিডিয়া এ দেশের শত বছরের ঐতিহ্যসমৃদ্ধ এবং অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গণ্য হলেও টেলিভিশন ও টেলিভিশন সাংবাদিকতার শৈশব এ দেশে এখনো কাটেনি। তাই এখানে পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা, সততা, সৎ সাহস, পরিবেশনার মুনশিয়ানার এখনো পুরোপুরি বিকাশ ঘটেনি। আবার প্রিন্ট মিডিয়াও আগের ঐতিহ্য রক্ষা করে যে পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার কথা, সে উচ্চতার কাছাকাছি যেতে পারেনি। উদাহরণ হিসেবে বলব, অতি সাম্প্রতিককালের করোনাকাণ্ড নিয়ে রিজেন্ট হাসপাতাল ও জিকেজিকেন্দ্রিক সপ্তাহকালব্যাপী বিভিন্নমুখী সংবাদ পরিবেশনার দৈর্ঘ্য-প্রস্ত, ব্যাপ্তি, গভীরতাকে প্রতিটি মিডিয়া হাউজ ধরে ধরে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। বিশেষত টেলিভিশনগুলোর শাহেদ করিমের সাতক্ষীরা থেকে হেলিকপ্টারে উড়িয়ে ঢাকা আনার ৪-৫ ঘণ্টার পুরো এপিসোড সরাসরি সম্প্রচার করা কতটুকু সুখকর এবং কতটুকু বিরক্তিকর। ডাক্তার সাবরিনা ও আরিফুলের সংবাদগুলোর পরিবেশনায় কিছু পর্নো উপাদানের মিশ্রণ ছিল মূলধারার সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতাবিরোধী কিংবা শাহেদ করিমের ভিলেন চরিত্র চিত্রণে যতটুকু অতিকথন, কিন্তু ভিলেনের পেছনের ভিলেনদের ক্ষেত্রে ততটুকুই চেপে যাওয়া বা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বা প্রয়াস লক্ষণীয়।

সাংবাদিকতার ভাষায় ‘হলুদীকরণ’ বলতে যা বোঝায়, তার কিছু প্রকাশ খবরের কাগজ ও টেলিভিশন সর্বত্র দেখা যায়। আবার কিছু টিভি সাংবাদিকতাকে পুলিশ-র্যাবের ‘এম্বেডেড জার্নালিজম’ বলে মনে হয়েছে। তারা র্যাব-পুলিশকে দেখাতে অনেক বেশি সপ্রতিভ। পুলিশের দিক থেকেও মিডিয়াকে একটি অশুভ তত্পরতার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রাখার একটি কৌশলও লক্ষণীয়; যা তদন্তকার্যের সুষ্ঠুতা ও নিরপেক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে হয়। যেমন রিমান্ডে থাকা ব্যক্তি কি বলল না-বলল, তা সরাসরি মিডিয়ায় প্রকাশ করা কতটুকু সংগত! যে তদন্তের ভিত্তিতে চার্জ গঠন হবে এবং সে চার্জ আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের মুখোমুখি হবে, তা নিয়ে মুখরোচক কাহিনী লেখা মূলধারার গণমাধ্যমের জন্য কতটুকু নৈতিক, তা ভেবে দেখতে অনুরোধ করি। যারা অপরাধ ও আদালতের কর্মকাণ্ডের ওপর রিপোর্ট করেন, তারা আইনজীবী ও পুলিশের সঙ্গে অবশ্যই সম্পর্ক রাখবেন, কিন্তু তা যেন পুলিশ বা অন্য কারো আত্মপ্রচারে ব্যবহার না হয়, সেদিকটি দেখতে হবে। আবার একজন রিপোর্টারও যেন তা নিয়ে সত্য-মিথ্যা বা অনুমাননির্ভর রহস্য উপন্যাসের কথা-কাহিনী সৃষ্টি না করেন, সেদিকে লক্ষ রাখা সম্পাদকের দায়িত্ব।

বাংলাদেশে পাঠক-দর্শক-শ্রোতাদের রুচি এত নিম্নমানের নয়। এ দেশের সংবাদপত্রের পাঠক ও টেলিভিশনের দর্শকরা নিঃসন্দেহে রুচিশীল। কিছু গণমাধ্যম সে বিষয়টি মাঝেমধ্যে ভুলে যায়। আপনারা যাই দেবেন, পাঠক-দর্শক তা-ই নির্দ্বিধায় গ্রহণ করবেন, তা ঠিক নয়। তাছাড়া ভালো মানের সংবাদ, সংবাদভাষ্য, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সম্পাদকীয় প্রকাশ করে ক্রমাগতভাবে পাঠক-দর্শক রুচি তৈরির একটি দায়িত্বও মূলধারা গণমাধ্যমকে নিতে হবে। পাঠক-দর্শককে একটা সময় পর্যন্ত আপনি যা দেবেন, তা নিতে হবে। কারণ পাঠক-দর্শক নিজে তো স্রষ্টা নন। আপনি বা গণমাধ্যম যা সৃষ্টি করেন, একজন পাঠক বা দর্শককে কোনো কোনো সময় বাধ্য হয়ে তা নিতে হয়। তা কিন্তু সবসময়ের জন্য সত্য নয়। একসময় হয়তো তিনি বিকল্প অনুসন্ধান করেন এবং সে বিকল্পও তো গণমাধ্যকেই সৃষ্টি করতে হবে। তাই প্রিন্ট মিডিয়াকে যেমন রুচিশীল পাঠকের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে, তেমনিভাবে টেলিভিশনকেও দর্শক রুচির ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে রুচিশীল পাঠক-দর্শক তৈরির একটি সামাজিক দায়িত্বও সবাইকে গ্রহণ করতে হবে।

পাঠক-দর্শক-শ্রোতামণ্ডলী গণমাধ্যমের বাস্তব সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অনবহিত তা নয়। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সর্বোত্কৃষ্ট প্রডাকশন ভোক্তারা (পাঠক-দর্শক-শ্রোতারা) সবসময়ই আশা করবে। সেখানেই গণমাধ্যমের শৈল্পিক সফলতার বিষয়টি প্রকাশ পাবে। বাকিটা ব্যবসায়িক শিল্পের সাফল্য। এ শিল্প দুই ধারী তরবারি। এর এক হাতে পণ্য উৎপাদনের ব্যবসায়িক শিল্প (ইন্ডাস্ট্রি), অন্য হাতে সংস্কৃতি ও শিল্পকলা তথা আর্টের সফলতা। গণমাধ্যম এ দুই শিল্পের ভারসাম্য রক্ষা করে প্রতিনিয়ত নিজের সঙ্গে নিজেরাই প্রতিযোগিতা করে এগোবে—এটিই রুচিশীল পাঠক, দর্শক ও শ্রোতাদের প্রত্যাশা।

ড. তোফায়েল আহমেদ: শাসন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *