গণপরিবহনে চাঁদাবাজিকে প্রাতিষ্ঠানিক করতে সার্ভিস চার্জের প্রস্তাব

নিউজ দর্পণ,ঢাকা: গণপরিবহনে চাঁদাবাজি যেমন দীর্ঘদিনের, তেমনি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাও বেশ পুরনো। এবার এ চাঁদাবাজিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন শ্রমিক নেতারা। চাঁদাবাজি নাম বদলে পরিচালন ব্যয় বা সার্ভিস চার্জ আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছেন তারা। এ প্রস্তাব এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত হিসেবে অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি।

দেশের সড়ক পরিবহন খাতের শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। সারা দেশে শুধু ফেডারেশনের আওতায় রয়েছে ২৪৯টি শ্রমিক ইউনিয়ন। ঢাকায় বাস ও ট্রাক টার্মিনালকেন্দ্রিক শ্রমিক ইউনিয়ন ছাড়াও প্রতি জেলায় অন্তত দুটি করে বাস ও ট্রাকের শ্রমিক ইউনিয়ন আছে। অন্যদিকে শ্রম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তথ্য বলছে, দেশের সড়ক পরিবহন সেক্টরে মালিক ও শ্রমিকদের সংগঠনের সংখ্যা ৯৩২। এসব সংগঠনের আয়ের প্রধান উৎস যানবাহন থেকে দৈনিক আদায় হওয়া চাঁদার টাকা। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি আবুল কালাম গত বছর এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন, ঢাকায় চলাচল করা প্রতিটি বাস থেকে দৈনিক ৪০ টাকা আদায় করে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ আদায় করে আরো ৩০ টাকা। তার দেয়া হিসাবে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ৪-৫ লাখ টাকা প্রতিদিন চাঁদা আদায় হয় মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে।

সাতটি জেলার পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের তুষ্ট করে তারপর ঢাকা-রংপুরের মধ্যে চলতে পারে একটি বাস। আলাদাভাবে চাঁদা দিতে হয় প্রতিটি জেলার শ্রমিক সংগঠনগুলোকে। শুধু শ্রমিক সংগঠন নয়, চাঁদা দিতে হয় বাস মালিক সংগঠনগুলোকেও। এতে ঢাকা থেকে রংপুর যেতে একটি বাসের শুধু চাঁদা বাবদই চলে যায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা।

একইভাবে দেশের সব স্বল্পপাল্লা ও দূরপাল্লার পথে চলাচল করতে ও ট্রাক থেকে প্রতিদিনই চাঁদা আদায় করে আসছে পরিবহন শ্রমিক ও মালিক সংগঠনগুলো। দেশে বাণিজ্যিক গাড়ির সংখ্যা আট লাখের বেশি। এসব গাড়ি থেকে ৪০ টাকা হারে মালিক সংগঠন ও ৩০ টাকা হারে শ্রমিক সংগঠনগুলো আদায় করে। এ হিসেবে বছরে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকা এসব গাড়ি থেকে চাঁদা আদায় করা হয়।

৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাবেক নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। এ সভায় সমগ্র বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন শ্রমিক সংগঠন চাঁদাবাজি বন্ধ করে পরিচালন ব্যয় (সার্ভিস চার্জ) সংগ্রহের প্রস্তাব দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী। সেই সভাতেই প্রস্তাবটি কিছুটা সংশোধন করে বাস্তবায়নের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

গণপরিবহনে চাঁদাবাজিকে এভাবে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করার বিষয়টি নিয়ে গতকাল একাধিকবার সেলফোন কল ও ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে যোগাযোগ করা হয় শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলীর সঙ্গে। তবে তিনি ফোন ধরেননি। পরে বিষয়টি সম্পর্কে সংগঠনটির আরেক শীর্ষস্থানীয় নেতা বণিক বার্তাকে বলেন, পরিবহন থেকে চাঁদা আদায়ের বর্তমান ব্যবস্থাটি বেশ বিশৃঙ্খল। এর সুযোগ নিয়ে একটি শ্রেণী বিভিন্ন সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে অবৈধভাবে চাঁদা তুলছে। এটি বন্ধ করার জন্যই চাঁদাবাজির বদলে শুধু সংগঠন পরিচালনার জন্য সার্ভিস চার্জ আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাঁদা আদায়ের বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার চেষ্টা হয়েছে এর আগেও। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চাঁদার হার ঠিক করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব দিয়েছিলেন শ্রমিক নেতারা। ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তত্কালীন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একাধিক বৈঠকে তারা বিষয়টি উত্থাপন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে সে সময় যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেয়া হয়। তবে চাঁদার হার ঠিক করে প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়টি আমলে নেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *