কান্তাকে হোটেলে নিয়ে হত্যা করে যেভাবে লাশ ফেলা হয় সাগরে

নিউজ দর্পণ, ঢাকা: প্রায় দুই বছর আগে রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ায় কান্তা বিউটি পার্লারের মালিক মার্জিয়া আক্তার কান্তাকে (২৬) কুয়াকাটার একটি আবাসিক হোটেল কক্ষে গলা টিপে হত্যার পর এবার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে বেরিয়ে এসেছে হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য।

পিবিআই জানিয়েছে, স্বামী ও তার এক সহযোগী কান্তাকে নিয়ে ওই হোটেলে পর্যটক হিসেবে উঠার পর তাকে হত্যা করে পলিথিনে লাশ মুড়িয়ে খাটের নিচে রেখে পালিয়ে যান। বিষয়টি হোটেল কর্তৃপক্ষের নজরে এলে ঝামেলা এড়াতে তারা রাতের অন্ধকারে কান্তার লাশ বস্তায় ভরে মোটরসাইলের পেছনে তুলে নিয়ে সাগরে ভাসিয়ে দেয়।

ঘটনার দুই বছর হতে চললেও এতদিন ওই হোটেল কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে ও খুনিরাও ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে। গতকাল রবিবার নরসিংদী পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. এনায়েত হোসেন মান্নান সংবাদ সম্মেলন করে হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নরসিংদী জেলা পিবিআর-এর পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, নরসিংদী জেলার বেলাবো থানার সোহরাব হোসেন রতনের মেয়ে মার্জিয়া আক্তার কান্তা আশুলিয়ায় বিউটি পার্লারের ব্যবসা করতেন। সেখানে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার শহিদুল ইসলাম সাগর নামে একজনের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে তাদের বিয়ে হয়।

বিয়ের কিছুদিন পর মার্জিয়া জানতে পারেন তার স্বামী সাগরের আরও এক স্ত্রী রয়েছে। বিষয়টি গোপন রেখে তাকে বিয়ে করায় তা সহজে মেনে নিতে পারেননি মার্জিয়া। এ নিয়ে ব্যক্তিগত ফেসবুক স্ট্যাটাসে স্বামী সাগরকে প্রতারক ও লম্পট আখ্যা দেন কান্তা।

এক পর্যায়ে ভারতে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে কান্তার মন জয় করে সাগর। ২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আশুলিয়া থেকে এই দম্পতি প্রথমে শরীয়তপুরে আবাসিক হোটেল নূর ইন্টারন্যাশনালে গিয়ে রাত কাটান। সেখানে শহিদুলের মামাতো ভাই ও কিলিং মিশনের সহযোগী মামুন তাদের সঙ্গে যুক্ত হন। পরদিন তারা তিনজন কুয়াকাটায় গিয়ে আবাসিক হোটেল আল-মদিনায় একটি কক্ষে উঠেন।

২৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে ওই হোটেল কক্ষে তালা ঝুলতে দেখে কোনও সাড়াশব্দ না পাওয়ায় হোটেল কর্তৃপক্ষের সন্দহ হলে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কান্তার ব্যবহৃত জামাকাপড় জব্দ করে নিয়ে গেলেও খাটের নিচে লাশ থাকার বিষয়টি তাদের নজরে আসেনি।

এর আরও দুদিন পর (২৫ সেপ্টেম্বর) ওই কক্ষ থেকে দুর্গন্ধ বের হতে থাকলে হোটেল ম্যানেজার আমির ও হোটেল বয় সাইফুলের নজরে আসে বিষয়টি। তারা হোটেল মালিক দেলোয়াকে ঘটনা জানালে দেলোয়ার, তার ছোটভাই আনোয়ার, হোটেল ম্যানেজার আমির ও বয় সাইফুল চারজন মিলে লাশ গুমের সিদ্ধান্ত নেয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ওইদিন রাতেই ১১টার দিকে লাশ বস্তায় ভরে মোটরসাইকেলের পেছনে তুলে দেলোয়ার ও আনোয়ার কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম দিকের লেম্বুচর এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে গলা সমান সাগরের পানিতে নেমে লাশ ভাসিয়ে দিয়ে দুই ভাই হোটেলে চলে আসে।

ঘটনার প্রায় ১ বছর ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি মার্জিয়া কান্তার বাবা সোহরাব হোসেন রতন বাদী হয়ে হত্যাপূর্বক লাশ গুমের একটি মামলা দায়ের করেন। নরসিংদী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতে করা ওই মামলায় কান্তার স্বামী শহিদুল ইসলাম সাগরসহ তার পরিবারের ৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়।

আদালতের নির্দেশে পরবর্তীতে মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। তদন্তে নেমে সাগরকে গ্রেফতার করা হয়। সবশেষ গেল ১ সেপ্টেম্বর সাগরের মামাতো ভাই মামুন পিবিআইয়ের হাতে গ্রেফতার হলে তদন্তে গতি ফিরে।

এরপর মামুনের দেয়া তথ্যানুযায়ী তাকে নিয়ে গেল বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) কুয়াকাটার সেই আবাসিক হোটেল আল-মদিনায় যায় পিবিআই। এসময় হোটেল মালিক দেলোয়ার, তার ছোটভাই আনোয়ার, হোটেল ম্যানেজার ও বয় কান্তার লাশ গুমের সত্যতা স্বীকার করে। পরে ওই ৪ জনকে গ্রেফতার করে নরসিংদী নিয়ে যায় পিবিআই।

এ ব্যাপারে পিবিআই পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃতরা হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের সত্যতা স্বীকার করেছেন। তাদেরকে আদালতে তোলা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *