আ স ম হান্নান শাহ’র চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নিউজ দর্পণ, ঢাকা:  শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহকর্মী ও সহযোদ্ধা (অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী) আ স ম হান্নান শাহ’র চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টে¤॥^র তারিখে সিঙ্গাপুরের র‌্যাফেলস হার্ট সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরন করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আ স ম হান্নান শাহ্ ১৯৪১ সালের ১১ অক্টোবর গাজীপুরের কাপাসিয়ার ঘাগটিয়া ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শের রাজনীতিবিদ। তিনি ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। তাঁর বাবার নাম ফকির আবদুল মান্নান শাহ্। তাঁর বাবা ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। হান্নান শাহ্’র স্ত্রীর নাম নাহিদ হান্নান। তাদের এক মেয়ে শারমিন হান্নান সুমি এবং দুই ছেলে শাহ্ রেজাউল হান্নান রেজা ও শাহ্ রিয়াজুল হান্নান রিয়াজ। তাঁর ছোটভাই শাহ্ আবু নঈম মোমিনুর রহমান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জেষ্ঠ্য বিচারপতি ছিলেন। ১৯৬২ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়া হান্নান শাহ্ বিভিন্ন সেনানিবাসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অন্য বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। ১৯৭৩ সালের সেপ্টে¤॥^রে বাংলাদেশে ফিরে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এইচ এম এরশাদ সরকারের সময় তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যান। তিনি পার্বত্য চট্রগ্রামের ব্রিগেড কমান্ডার, চট্রগ্রামের মিলিটারি একাডেমির কমান্ডেন্ট, যশোর স্কুল অব ইনফ্রেন্টি এন্ড টেকটিক্স এর চিফ ইন্সট্রাক্টর, পাকিস্তানের কোয়েটার আর্মি কলেজ অব ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইন্সট্রাক্টরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালে ৩০ মে চট্রগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল সেনাবাহিনীর হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হবার পর উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে রাঙ্গুনিয়া থেকে প্রেসিডেন্টের মরদেহ ঢাকায় নিয়ে আসেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হান্নান শাহ্। এইচ এম এরশাদ সরকার হান্নান শাহকে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়। তিনি সরকারের সংস্থাপন মন্ত্রনালয়ের যুগ্ম-সচিব (এপিডি) ছিলেন। সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর এরশাদ সরকারের সময়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছিলেন হান্নান শাহ। ১৯৮৩ সালে ওই পদ ছেড়ে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপিতে যোগ দেন।

বিএনপিতে যোগদানের শুরুতে তিনি ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দলের ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
হান্নান শাহ্ ১৯৯১ সাল ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে গাজীপুর-৪ আসন (কাপাসিয়া) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সরকারের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলে তাকে বিএনপি’র সবোর্চ্চ ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়। হান্নান শাহ্কে পরবর্তী বছর অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ কাউন্সিলেও তা বহাল থাকে। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তার এই পদ বহাল ছিলো। তিনি কাপাসিয়ার শীতল্যা নদীর উপর ‘ফকির মজনু শাহ্ সেতু’র সফল বাস্তবায়নসহ এলাকার সার্বিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন।

হান্নান শাহ’র পুরো নাম আবু সাঈদ মতিউল হান্নান শাহ্। তিনি বিএনপিতে যোগদানের পর থেকে আমৃত্যু কাপাসিয়া বিএনপির নিরবিচ্ছিন্ন নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গত ৩ দশক হান্নান শাহ নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। একজন সেনা কর্মকর্তা থেকে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতা হিসাবে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। বিশেষত, মৃত্যুর আগে গত কয়েক বছর এক ধরনের অচলাবস্থায় নিপতিত হওয়া বিএনপিকে চাঙ্গা করতে ও বিএনপি কথিত ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’ আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন হান্নান শাহ। এ সময়গুলোতে দলের অন্যতম মুখপত্র হিসাবেও গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন বিশেষত বিএনপিপন্থী মহলের অপুরনীয় তি হয়েছে।
১/১১ এর কঠিন সময়ে বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে হান্নান শাহ্ বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ের সেনাসমর্থীত তত্ত্ববধায়ক সরকার ও দলের সংস্কারপন্থী অংশের ‘কর্মকান্ড ও ষড়যন্ত্র’ এর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের সামনে এসে সাহসী কন্ঠে কথা বলে দেশ-বিদেশে দলের নেতা-কর্মীদের দৃষ্টি কাড়েন তিনি। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে হান্নান শাহ্ বেশ কয়েকবার কারাগারে যান। একইভাবে তত্ত্ববধায়ক সরকারের আমলেও তাঁকে কয়েকবার কারাবাস করতে হয়েছে। ওই সময় তাঁর বিরুদ্ধে ৩০টির বেশী মামলা ছিলো।
আ স ম হান্নান শাহ’র চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে বিভিন্ন কর্মসূচি:
গাজীপুরের কাপাসিয়ার কৃতিসন্তান ও বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য মরহুম নেতা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত আ স ম হান্নান শাহ্’র চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী ২৭ সেপ্টে¤॥^র, রোববার। এ উপলে তাঁর পরিবার ও দলের প থেকে হান্নান শাহ্’র রুহের মাগফিরাত কামনায় তাঁর গ্রামের বাড়ি ঘাগটিয়াতে কোরআনখানি, মিলাদ, দোয়া ও স্মরণ সভা এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের পুস্পস্তবক অপর্ণসহ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালিত হবে। ভার্চুয়াল স্মরণ সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখবেন বলে হান্নান শাহ্ পুত্র শাহ্ রিয়াজুল হান্নান রিয়াজ জানিয়েছেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর বাণী :

“মহান স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহকর্মী ও সহযোদ্ধা (অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী) আ স ম হান্নান শাহ’র চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে আমি তাঁর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে আততায়ীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হবার পর আ স ম হান্নান শাহ শহীদ জিয়ার মরদেহ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। আ স ম হান্নান শাহ’র মৃত্যুতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলই কেবল তিগ্রস্ত হয়নি, দেশ হারিয়েছে জাতীয় স্বার্থরার এক অকুতোভয় যোদ্ধাকে, জাতি হারিয়েছে তার এক সাহসী সন্তানকে। তাঁর মৃত্যু জাতির জন্য অপূরণীয় তি।
স্বৈরাচার বিরোধী ৯০’র গণঅভ্যূত্থানের একজন বীর, মন্ত্রীসভার সদস্য, ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন এর অবৈধ সরকারবিরোধী সংগ্রামের একজন বলিষ্ঠ কন্ঠ এবং বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে মরহুম হান্নান শাহ’র অনেক স্মৃতি আমাদেরকে এখনও বেদনার্ত করে। জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ও অবদান ইতিহাসে চিরঅম্লান হয়ে থাকবে। আমরা যদি এই দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অুন্ন রেখে, নাগরিকদের অধিকার সমুন্নত রেখে এবং জনগণের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে সম হই তাহলেই হান্নান শাহ’র বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে এবং তাঁর প্রতি উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করা হবে। আমি মরহুম হান্নান শাহ’র ইন্তেকালজনিত শোককে শক্তিতে পরিণত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহবান জানাচ্ছি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *