আপাতত ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে চান না শিল্পোদ্যোক্তারা

নিউজ দর্পণ, ঢাকা: করোনার তি কাটিয়ে উঠতে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির বিলম্ব মূল্য পরিশোধে আরও ছয় মাস সুযোগ চাচ্ছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। পাশাপাশি রুগ্ণ হয়ে পড়া ১৩৩ গার্মেন্টস কারখানার নামে নেওয়া ঋণের সুদ-আসল প্রায় ৭শ’ কোটি টাকা ফেরত দিতেই চান না তারা। এ ব্যাপারে সরকারের কাছে ‘বেলআউট’ সুবিধা চাচ্ছেন তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। একইভাবে প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে নেওয়া ঋণ দুই বছরের বদলে তারা পাঁচ বছরে শোধ করতে চান। এই নিয়ে সরকারের সঙ্গে আজ সোমবার দুই দফা বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন দেশের শিল্পোদ্যোক্তারা। বাণিজ্য সচিবের নেতৃত্বে এই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘যৌক্তিক কারণেই আমরা প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে নেওয়া ঋণ দুই বছরের বদলে পাঁচ বছরে শোধ দিতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘এক বছরের গ্রেস পিরিয়ড ও চার বছরে শোধ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া না হলে অধিকাংশ ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে পড়বেন।’ তিনি বলেন, ‘৭শ’ কোটি টাকার মতো বেলআট সুবিধা এই কারণে দরকার। যেসব কারখানা রুগ্ণ বা বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের পে টাকা দেওয়া সম্ভব না। আর শিল্পের কাঁচামাল আমদানির বিলম্ব মূল্য পরিশোধে আরও ছয় মাস সুযোগ যদি দেওয়া হয়, তাহলে আমরা টিকে থাকতে পারবো।’ আজ সরকারের সঙ্গে দু দফা বৈঠক আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সারা দুনিয়াতেই সরকার ব্যবসায়ীদের জন্য ফান্ড করেছে। আমরাও সেভাবেই সহযোগিতা চাচ্ছি।’ ব্যাংকের টাকা ফেরত না দিলে ব্যাংক চলবে কীভাবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এেেত্র একদিকে ব্যাংক মুনাফার টাকা ছাড় দেবে, অন্যদিকে সরকার ব্যাংকের বকেয়া দায় শোধ করবে।’

জানা গেছে, ১৩৩টি গার্মেন্টস কারখানার মধ্যে অনেক আগেই কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কিছু রুগ্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। এ অবস্থায় উল্লিখিত কারখানাগুলোর ব্যাংক ঋণের দায় বিশেষ বিবেচনায় অবসায়নের জন্য সরকারের কাছে গত বছরের নভেম্বরে আবেদন জানায় গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। ওই আবেদনের পর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত ১ ডিসেম্বর এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত জানতে চায়। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়ে দেয়, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যেহেতু গ্রাহকের আমানত দিয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেহেতু এ ধরনের ঋণ অবসায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনও নির্দেশনা দেওয়ার এখতিয়ার নাই। তবে সরকার চাইলে রুগ্ণ শিল্পগুলোর ঋণ অবসায়নের দায় নিতে পারে। সেেেত্র সরকারকে এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে।’

জানা গেছে, ১৩১টি তৈরি পোশাক কারখানার মূল ঋণ রয়েছে ৫৫২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, আয় খাতে নিট সুদ বাবদ দায় ১৪৭ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং মামলা খরচ ৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকাসহ ব্যাংকগুলোর মোট দায় দাঁড়িয়েছে ৬৮৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

এদিকে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) থেকে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে ২০২১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ইউজেন্স বিল অব ইমপোর্ট পেমেন্ট বা ডেফার্ড এলসি অথবা ঋণপত্রের বকেয়া দায় পরিশোধের জন্য ৬ মাস সময় চাওয়া হয়েছে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, করোনায় সুতা উৎপাদন, বস্ত্র তৈরি এবং কাপড় প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যাপকভাবে তিগ্রস্ত হয়েছে। সে কারণে এ সুবিধা প্রদান খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামালের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বাকিতে আমদানি মূল্য পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর এই অনুরোধ জানায় বিটিএমএ। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী খোকন স্বারিত চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানির মূল্য পরিশোধের ল্েয ইউজেন্স বিল অব ইমপোর্ট পেমেন্টের মেয়াদ আরও ছয় মাস বৃদ্ধির অনুরোধ জানাচ্ছি।’

ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘বৈশ্বিক মহামারি ও দেশের শিল্প খাতের প্রকৃত অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বিটিএমএ’র প থেকে শিল্প উদ্যোক্তাদের কাঁচামাল আমদানির মূল্য পরিশোধের সুবিধার্থে ওই সার্কুলারটির মেয়াদ আগামী বছরের (২০২১) ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানাচ্ছি।’

প্রসঙ্গত, তৈরি পোশাক খাতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বিশেষ করে সুতা ও কাপড়ের সিংহভাগ সরবরাহ করে বিটিএমএ তালিকাভুক্ত সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

বিজিএমইএ’র প থেকে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বর্তমানে পোশাক খাত গভীর সংকটময় সময় পার করছে। যদিও দেশে এই করোনাকালে খাত হিসেবে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে রফতানিমুখী পোশাকশিল্প। এই খাতের উদ্যোক্তারা ঋণ যেমন বেশি পেয়েছেন, তেমনি তাদের সুদও দিতে হয়ছে নামমাত্র। তিন দফায় সরকারের দেওয়া মোট ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণসুবিধার ৮০ শতাংশের বেশি পেয়েছেন তারা। খাতটি আরও ঋণ চেয়েছিল, কিন্তু সরকারের সায় না থাকায় তারা ঋণ পরিশোধের েেত্র দুই বছরের জায়গায় ৫ বছর সময় চাচ্ছে।

নতুন সুবিধা চেয়ে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সংগঠন (বিজিএমইএ) বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর একান্ত সহযোগিতা ও সদয় দৃষ্টি চেয়ে বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক চিঠি দিয়েছেন ৯ সেপ্টেম্বর।

বিজিএমইএ’র চিঠিতে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বর্তমানে পোশাক খাত গভীর সংকটময় সময় পার করছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। ক্রেতারা যেসব আদেশ দিচ্ছে এবং আগের ক্রয়াদেশের বিপরীতে যেসব পণ্য রফতানি হচ্ছে, সেগুলোর অর্থ পেতে ৮ থেকে ৯ মাসের বেশি সময় লাগবে।

প্রসঙ্গত, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সরকার এ পর্যন্ত এক লাখ ১১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকার মোট ২০টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রথম প্যাকেজটিই হচ্ছে রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি ও বেতন দেওয়ার জন্য। মাত্র ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে কারখানার মালিকেরা ঋণ নিয়ে বেতন-মজুরি দেন। পরে তাদের আবেদনের কারণে আরও দেওয়া হয় ৩ হাজার কোটি টাকা। এপ্রিল, মে, জুন ও জুলাই এই চার মাসের বেতনভাতা দিতে সরকারের প্রণোদনা তহবিল থেকে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন পোশাক শিল্প মালিকরা।

শর্ত অনুযায়ী, ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ দুই বছরে ১৮টি সমান কিস্তিতে এই টাকা তাদের ফেরত দেওয়ার কথা। কিন্তু তারা এখন ওই অর্থ পরিশোধ করতে পাঁচ বছর সময় চেয়ে আবেদন করেছেন। আজকের বৈঠকে এ বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *