আইনের প্রয়োগ ও সিষ্টেম লস

নিউজ দর্পণ, ঢাকা: রিমান্ড (Re-mand) একটি ইংরেজী শব্দ। বাংলা একাডেমী প্রনীত  Re-mand শব্দের আভিধানিক অর্থে বলা হয়েছে যে, “আরো স্বাক্ষ্য প্রমান সংগ্রহের জন্য (অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আদালত থেকে) পুলিশের হেফাজতে পাঠানো বা পুন: প্রেরণ করা বা তদন্ত চলাকালে কিংবা আদালত কর্তৃক সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আইন ভঙ্গকারী শিশু ও কিশোরদের রাখার জন্য প্রতিষ্ঠান বা পুন: প্রেশন কেন্দ্র” (পৃষ্ঠা ৬০৫)।

ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৭(২) ধারায় প্রদত্ব বিধান বলে একজন অভিযুক্তকে আদালতের Custody থেকে পুলিশ Custody তে প্রেরণ করা আদেশ দিতে পারে। উক্ত আইনে বলা হয়েছে যে-

The Magistrate to whom an accused person is forwarded under this section may, whether he has or has not jurisdiction to try the case from time to time authorize the detention of the accused in such custody as such Magistrate thinks fit, for a term not exceeding fifteen days in the whole, If he has not jurisdiction to try the case or [send] it for trial, and considers further detention unnecessary, he may order the accused to be forwarded to a Magistrate having such jurisdiction: [Provided that no Magistrate of the third class, and no Magistrate of the second class not specially empowered in this behalf by the [Government] shall authorise detention in the custody of the police.]

আদালতের Custody থেকে কোন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পুলিশের Custody তে প্রেরণ করতে উক্ত আইনের বিধান বলে ম্যাজিস্ট্রেটকে নি¤œবর্ণিত তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।

(১) সংশ্লিষ্ট আসামীকে গ্রেফতার পূর্বক আদালতে প্রেরণ (Forward) করা হয়েছে কি না?

(২) আসামীকে ১৫ দিনের বেশী পুলিশ হেফাজতে প্রেরণ করা যাবে না।

(৩) পুলিশের আবেদনের উপর ভিত্তিকরে নহে, বরং ম্যাজিস্ট্রেট যদি (as such Magistrate     thinck fit) সার্বিক বিবেচনায় উপযুক্ত মনে করেন তবেই রিমান্ডের আদেশ দিবেন।

ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৭(২) ধারায় ব্যাখ্যায় হাই কোর্ট নি¤œবর্ণিত মন্তব্য প্রদান করেন।

“The word ‘forward’ used in sectin 167 CrPC means ‘act of sending’. Unless the accused is sent to the Magistrate and the Magistrate passing the order of remand without the accused being forwarded to him, the legal requirement is not complied with for the Magistrate to assume jurisdiction to pass the order of remand. The accused must be brought before the Magistrate prior to passing of and order of remand, no matter whether the accused is in police lockup or judicial custody.” [সূত্র: ৪৫ ডি.এল.আর (হাই কোর্ট) পৃষ্ঠা-৫৯৩]

হাই কোর্টের উক্ত মন্তব্য মোতাবেক “act of sending”  অর্থাৎ আসামীকে পুলিশ কর্তৃক প্রেরণ না করা হলে পুলিশ রিমান্ডে প্রেরণ করা যাবে না। অর্থাৎ কোন আসামী যদি আদালতে আতœসর্ম্পন করে তবে উক্ত আইনের বিধান মতে পুলিশের প্রার্থনা মোতাবেক রিমান্ডে প্রেরণ করা যাবে না। কিন্তু এখন দেখা যায় যে, পুলিশ হয়রানী থেকে বাচার জন্য কোন আসামী যদি আদালতে “আতœসর্ম্পন” করার পরও তাহাকে পুলিশ আবেদনক্রমে রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।

“রিমান্ড” বলতে জনসমাজে একটি আতঙ্ক রয়েছে। জনগণ মনে করে যে, দোষ স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য “রিমান্ড” একটি বৈধ পদ্ধতি যা পুলিশের নিকট একটি ব্লাঙ্ক চেকের মত। অত্যাচার নির্যাতনে রিমান্ডে আসামীর মৃত্যুর ঘটনা অজানা নয়। পুুলিশ “রিমান্ড”কে একটি ক্ষমতা হিসাবে ব্যবহার করে বিধায় “রিমান্ড বানিজ্য” নামে একটি কথা ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন না করার জন্য বানিজ্য, রিমান্ডে নির্যাতন করার জন্য প্রতিপক্ষের নিকট থেকে বানিজ্য, ক্ষমতাসীনদের রাজীখুশী রাখার জন্য বিরোধীদের নির্যাতন করার বানিজ্য, কাংখিত অর্থ পাওয়া না গেলে নির্যাতন প্রভৃতি মিলিয়ে মিডিয়ার ভাষা “রিমান্ড বানিজ্য” বেশ অর্থপূর্ণ বৈশিষ্ট লাভ করেছে।

অন্যদিকে “অপরাধ” তৎপরতার ধরন, পরিধি ও এর ব্যাপকতা নিয়ে জাতি আজ চিন্তিত। সামাজিক অপরাধ তৎপরতা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি আইনের অপপ্রয়োগও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জাতি অপরাধ দমন বা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে কারো প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না। সাধারণ মানুষ মনে করে কঠিন কঠিন আইন বা থানার সংখ্যা বৃদ্ধি করে বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করে অপরাধকে নিয়ন্ত্রণ বা এর পরিধি কমিয়ে আনা যাবে না। তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য জাতিকে অবশ্যই একটি অবস্থানে দাড়াতে হবে। অপরাধীর বিচার হওয়া যেমন বাঞ্চনীয়, অনুরূপ অভিযুক্ত ব্যক্তি যাহাতে ভিকটিম না হয় সে দিকেই দৃষ্টি রাখতে হবে।

দেশে আইন শৃঙ্খলার অবনতি, সরকারী দল হলে আইনের ধরা ছোয়ার বাহিরে প্রভৃতি ধ্যানধারনা থেকে আইনকে তোয়াক্কা না করার সংস্কৃতি, অন্যদিকে আকাশ সংস্কৃতি থেকে প্রাপ্ত নগ্নতা ও বেহায়পনা থেকে যৌন অপরাধ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে মানুষ দূরে সরে যাওয়ার কারণেও অপরাধের সংখ্যা, পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কিছু অপরাধ রয়েছে যা দৈন্যতা ও গরীবির সাথে সম্পৃক্ত। কিছু অপরাধ রয়েছে উচ্চ বিলাসের সাথে সম্পর্কীত। কিছু অপরাধ রয়েছে উশৃঙ্খল আচরনের সাথে সম্পর্কীত। কিশোর গ্যাং বা ঔাঁবহরষব উবষরহয়ঁবহপু বাংলাদেশে বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে। অন্যদিকে রয়েছে গণধর্ষণ বা গ্যাং রেপ। কিশোর গ্যাং এবং গণধর্ষণে যারা জড়িত হওয়ার বিষয়টি অবশ্যই মানসিক বিকার গ্রস্থ থেকে উৎবুদ্দ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, আকাশ সংস্কৃতি ও পারিবারিক অনুশাসনের ব্যাপ্তয়ের কারণেই সমাজের একটি অংশ মানসিক রোগীতে পরিনত হয়েছে। প্রতিকারের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যতটুকু পদক্ষেপ নেয়া দরকার ততটুকু করা হচ্ছে না। রাষ্ট্র এখন পাঁচ মিশালী ধ্যান ধারনায় ব্যস্ত। নাগরিকদের নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া বা নৈতিক আর্দশে দীক্ষিত করার জন্য রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা নাই, যা হচ্ছে গতানুগতিক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সার্টিফিকেট বিক্রির প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়েছে। কোন পরীক্ষা ও পরীক্ষার ফল প্রকাশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সিডিউল ঠিক রাখতে পারছে না, ফলে শেসনচার্জ একটি অস্থিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিবৎসর। যার জন্য দায়ী উচ্চ শিক্ষায় ডিগ্রীপ্রাপ্ত “ডক্টরেট” কর্মকর্তাগণ।

আলোচ্য প্রসঙ্গ “আইন প্রয়োগে ব্যাপ্তয়” দিয়ে শুরু করলেও প্রাসঙ্গিক ভাবে অপরাধ সংগঠিত হওয়ার বিষয়গুলি চলে এসেছে। দেশের আর্থসামাজিক অবস্থাকে মাথায় রেখেই আইন প্রনয়ন হওয়া বাঞ্চনীয় এবং এর প্রয়োগে যাতে কোন স্বেচ্ছাচারিতা না হয় তাহাও নিয়ন্ত্রণ করার রায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় মূলত তিনটি বিভাগকে কেন্দ্র করে যথা : (১) নির্বাহী বিভাগ, (২) বিচার বিভাগ ও (৩) আইন বিভাগ। কিন্তু নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব সর্বক্ষেত্রে বিরাজমান বিধায় শাসকদের মর্জি মত আইন পরিচালিত হচ্ছে, আইন মোতাবেক শাসনকার্য পরিচালিত হচ্ছে না। পুলিশ নির্বাহী বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এ হাতিয়ারকে শাসকদল যে ভাবে খুশী প্রয়োগ করছে বিধায়ই আইন অমান্য করার একটি সাধারণ প্রবনতা মানুষের মধ্যে পরিলক্ষিত। পুলিশ জনগণের আস্থা হারিয়েছে যা কর্তাদের সুন্দর সুন্দর বুলি দিয়ে গণ আস্থায় আনা যাচ্ছে না। “কোন দেশে ধর্ষণ নাই? এ কথা বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি বুঝাতে চেয়েছেন তাহাও আঁচ করা যাচ্ছে না।

তাছাড়া দেশে এখন চলছে System Loss|  সরকারের যে কোন বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তর যাহাই হউক না কেন সেখানে অতিরিক্ত টাকা অর্থাৎ ঘুষ ছাড়া কোন কাজ হয়। ড্রাইবার, পিয়ন হয়ে যায় শত কোটি টাকার মালিক, সরকারী দলের চুনপুটি নেতারা করছে হাজার হাজার কোটি টাকার মানি লন্ডারিং। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সার্ভিস অরিয়েনটেড অরগানাইজেশনগুলি যথা বিদ্যুৎ, গ্যাস, রাজউক, ওয়াসা, টেলিফোন, আয়কর বিভাগ প্রভৃতি যে যেখানে যে অবস্থায় আছে অতিরিক্ত টাকা অর্থাৎ ঘুষ না পেলে কোন কাজ করে না। এমতাবস্থায়, সার্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সিষ্টেম লস থেকে বাংলাদেশকে উর্দ্ধার করা দরকার, নতুবা অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

একটি রাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রতিহিংসা যখন চরম ভাবে দেখা দেয় তখন রাজনীতির বাহিরে একটি গন্ডি সৃষ্টি হয় যারা ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাহীনদের বিরোধীতার সূযোগে নিজেদের ভাগ্য রাতা রাতি বদলে ফেলতে পারবে। একটি দল যখন পুলিশ ও আমলাদের বদৌলতে জোরপূর্বক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে তখন ক্ষমতাসীনরা তাদের দূর্বলতা ঢাকার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই আপোষ করে। নানাবিধ দূর্নীতি, মানি লন্ডারিং, ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা বিদেশে পাঁচার হওয়া, সরকারী মালামাল ক্রয়সহ সরকারের উন্নয়নমূলক কাজে মহাচুরির যে মহাউৎর্সব চলছে, তা সরকারের আপোষ কামিতারই পরিচয় বহন করে।

দেশে সিষ্টেম লসের অরাজকতা প্রকট আকার ধারণ করায় কেহই (সরকার বা বিরোধী দল) নিরাপদ নহে। পুলিশ দিয়ে প্রতিপক্ষকে নির্যাতনের ফয়দা পুলিশ যেমন নিচ্ছে, তাতে সরকারী আমলা ও দলীয় নেতা কর্মীরা পিছিয়ে নাই। পক্ষান্তরে ভোগান্তি হচ্ছে জনগণের।

লেখক

– তৈমূর আলম খন্দকার

রাজনীতিক, কলামিষ্ট ও আইনজীবি (এ্যাপিলেট ডিভিশন)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *